এই সময়, পানিহাটি ও কলকাতা: জল্পনা চলছিল আগে থেকেই। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির দ্বিতীয় দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে পানিহাটি থেকে পদ্ম শিবিরের হয়ে নিজেই প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করলেন আরজি করের নির্যাতিতা তরুণীর মা। বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যমে তিনি নিজে থেকেই তিনি সে কথা জানালেও, এ দিন বিজেপির প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রার্থিতালিকায় পানিহাটির নাম রাখা হয়নি। এ বিষয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও কোনও মন্তব্য করতে চাননি। গেরুয়া শিবিরের একাংশের দাবি, একেবারে শেষ মুহূর্তে নির্যাতিতার মা প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করায় এই তালিকায় তাঁর নাম যুক্ত করা যায়নি। অন্য একটি সূত্রের দাবি, নির্যাতিতা ও তাঁর আত্মীয়দের নাম প্রকাশ নিয়ে আইনি জটিলতার কারণেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না পদ্ম শিবির।
নির্যাতিতার মা ভোটে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে নাগরিক সমাজের মধ্যে। ২০২৪–এ পানিহাটির বাসিন্দা ওই তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে রাজপথে যাঁরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এ দিন অভয়ার মা প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন সিপিএম নেতৃত্বকে। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় হতাশা গোপন করেননি সিপিএম নেতৃত্বও।
এ দিন দুপুরে নির্যাতিতার মা জানান, দিন কয়েক আগে পানিহাটির সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘কলতানকে আমরা বলেছিলাম তাঁরা তাঁদের মতো ভোট প্রচার করুন। কিন্তু আমার মেয়েকে যেন ভোটের প্রচারে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার না করেন। বাস্তবে দেখা গেল, ওঁরা ২০২৪–এর ৯ অগস্টের সেই ভিডিয়ো ফের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে ভোট চাইছেন।’ পানিহাটিতে এ বার তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর। আরজি করের ঘটনার পরে নির্যাতিতার দেহ তড়িঘড়ি দাহ করতে উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল নির্মলের বিরুদ্ধে।
নির্যাতিতার মা বলেন, ‘বুধবার দুপুরে বিজেপি নেতৃত্বকে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে তাঁদের হয়ে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করি। রাতে বিজেপির দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়।’ ওই দম্পতির অভিযোগ, সিপিএম প্রথম থেকে এই আন্দোলন শুরু করলেও এর পিছনে সুকৌশলে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অভিসন্ধি ছিল তাদের। যে কারণে, বিজেপিকে কখনও এই আন্দোলনে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। যদিও সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ বলেন, ‘সন্তানহারা মা–বাবার যন্ত্রণাকে আমরা অসম্মান করতে চাই না। উনি ভোটে দাঁড়াতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য সিপিএমকে দুর্নাম করার কোনও প্রয়োজন ছিল না। যে অসংখ্য বাম কর্মী, নেতা ও সাধারণ মানুষ অভয়ার বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশি হেনস্থার শিকার হলেন, তাঁদের এই অপমান প্রাপ্য ছিল না।’ উত্তরপাড়ার সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘কে কী রাজনীতি করবেন সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু অভয়া আমাদের সবার মেয়ে।’ তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিমেরও বক্তব্য, ‘আরজি করের ঘটনা নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপি যে রাজনীতি করেছে তা স্পষ্ট হয়ে গেল।’
নির্যাতিতার মা–বাবার দাবি, সিপিএমের কাছে দিন পনেরো আগে তাঁরা পানিহাটি, খড়দহ এবং ব্যারাকপুরে প্রার্থী না দেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। যাতে ভোট ভাগাভাগি হয়ে তৃণমূলের সুবিধা না হয়ে যায়। সিপিএম সেই প্রস্তাব মানেনি। কিন্তু অতীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহরা যে তাঁদের সঙ্গে দেখাই করতে চাননি? সেই প্রসঙ্গে নির্যাতিতার বাবা বলেন, ‘তখন হয়তো নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহদের সময় হয়নি। তবে তৃণমূলকে সমূলে উৎখাত করার লড়াইতে নামলে হয়তো একদিন প্রধানমন্ত্রী আমাদের বাড়িতেই আসবেন।’ যদিও মেয়ের মৃত্যুতে এখনও ন্যায়বিচার না–পাওয়ায় সিবিআইকে দুষছেন তাঁরা।
বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, ভোট ঘোষণা হওয়ার আগে থেকেই দলের তরফে একাধিকবার ওই পরিবারকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা রাজি হননি। বুধবার রাতে তাই পানিহাটি আসনটি বাদ রেখেই মোদী–শাহদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার তালিকা নিয়ে আলোচনায় বসেন শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীরা। বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, অভয়ার মা প্রার্থী হতে চান কি না। তাই বুধবার রাতে দিল্লিতে ইলেকশন কমিটির বৈঠকে পানিহাটি আসনটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পরের দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলা হবে।’
এ দিনের ঘটনাপরম্পরায় চিকিৎসকদের আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতো বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার কোনও সম্পর্ক নেই।’ আরজি কর আন্দোলন চলাকালীন রাত দখলের ডাক দেওয়া রিমঝিম সিনহা বলেন, ‘উনি খুব ভুল করছেন। নিজের মেয়ের বিচারের জন্য উনি বাংলার মেয়েদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিতে দিয়ে উন্নাও, হাথরস, কাঠুয়া, বিলকিস বানুর ধর্ষকদের দলে নাম লেখাচ্ছেন।’ অভয়া মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্রের কথায়, ‘অভয়ার ন্যায় বিচারের আন্দোলন বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেনি। ফলে কোনও ব্যক্তি বিশেষের উপরে এই আন্দোলন নির্ভর করে নেই।’
আইনজ্ঞদের একাংশ বলছেন, নির্যাতিতার মায়ের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা না–করার পিছনে আইনি জটও রয়েছে।
২০১৮-র নিপুণ সাক্সেনা কেসে, সুপ্রিম কোর্ট বিস্তারিত নির্দেশে জানিয়েছিল, যৌন নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় যে মিডিয়ায় প্রকাশ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০২৪-এর ২১ অগস্ট অভয়ার নাম-পরিচয় প্রকাশ বন্ধের জন্য একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, ধর্ষণের শিকার কোনও মেয়ের পরিচয় প্রকাশ করা তাঁর মর্যাদা রক্ষার পরিপন্থী। কেন্দ্রকে তারা নির্দেশ দেয়, ওই তরুণীর পরিচয় প্রকাশ্যে আসে, এমন সব ছবি–ভিডিয়ো ইত্যাদি সোশ্যাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নির্যাতিতার মা প্রার্থী হলে তাঁর নামে দেওয়াল লিখন বা ব্যানার পোস্টারে ছবি ছাপা হবে কী ভাবে? এই প্রসঙ্গে নির্যাতিতার বাবা বলেন, ‘আমরা প্রকাশ্যে আসতে চাই। আমরা পরিচয় প্রকাশ্যে আনতে আদালতে দু’বার হলফনামা দিয়েছি। তা আদালত খারিজ করে দিয়েছে।’ ওই দম্পতি গত ৮ মার্চ নারী দিবসে মেয়ের সঙ্গে নিজেদের একটি ছবি পোস্ট করেন এবং তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, ‘নির্যাতিতা যদি মারা যান বা তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকে বা তিনি যদি মানসিক ভাবে সুস্থ না হন, সে ক্ষেত্রেও তাঁর নিকটতম আত্মীয়ও কোনও ভাবেই তাঁর পরিচয় বহন করে এমন কোনও কিছু প্রকাশ করতে পারেন না।’ কোর্টের ব্যাখ্যা, পরিচয় একান্ত প্রকাশ করতে হলেও সেক্ষেত্রে একজন সেশন জজের উপস্থিতিতে লিখিত সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ অভয়ার মা-বাবা মেয়ের ‘বিচার’ চেয়ে যে ছবি পোস্ট করেছেন তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।