দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ: গতবার তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন উলুবেড়িয়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। সেখান থেকে সরিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছে বিজেপির শক্তঘাঁটি বলে পরিচিত হুগলির গোঘাটে। গত ভোটে এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী। গত কয়েক বছরের ট্র্যাকরেকর্ড অনুযায়ী, তৃণমূল এখানে অনেকটাই দুর্বল। তার উপরে আবার বিরোধীদের কাছ থেকে জুটেছে ‘বহিরাগত’ তকমা। তবে পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন গোঘাটের তৃণমূল প্রার্থী নির্মল মাজি। প্রচারে বেরিয়ে কখনও তিনি ঢুকে পড়ছেন লোকের বাড়িতে। মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরের কাছে মাথা ঠুকছেন। প্রচারের ফাঁকে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মুড়ি–চানাচুর খাচ্ছেন। বাছুরকে আদর করছেন। গ্রামবাসীদের সঙ্গে খোল ও করতাল হাতে নাম সঙ্কীর্তন করতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। কখনও আবার ছোট্ট শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে এই বলে আশীর্বাদ করছেন, বড় হয়ে সে যেন ডাক্তার হয়। হাবেভাবে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক।’
বৃহস্পতিবার বেলার দিকে নির্মল ভোট প্রচারে বেরিয়েছিলেন গোঘাটের বালি গ্রাম পঞ্চায়েতের জগৎপুর এলাকায়। সেখানে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচার করেন। সামনেই কোনও বয়স্ক মানুষকে দেখলেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছেন। তৃণমূলের প্রার্থী গ্রামে প্রচারে এসেছে শুনে অনেক বাড়ির সামনে মহিলারা অপেক্ষা করছিলেন। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটি বাড়ির সামনে ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক বধূ। তাঁকে দেখেই হাত বাড়িয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নেন নির্মল। শিশুটিকে আদর করে তিনি বলেন, ‘বাবু কী হতে চাও? ডাক্তার হবে তো?’ শিশুটিকে আশীর্বাদ করে তিনি বলেন, ‘এ যেন বড় হয়ে ডাক্তারই হয়।’
গ্রামের একটি বাড়িতে ঢুকে িনর্মল দেখতে পান, গোয়ালের পাশে একটি বাছুর বাঁধা রয়েছে। সবাইকে অবাক করে তিনি প্রথমেই বাছুরের দিকে এগিয়ে যান। বাছুরের পিঠে হাত বুলিয়ে দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’
প্রচার ঠিকঠাক চললেও একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তাল কেটে যায়। ওই গ্রাম থেকে বেরোনোর মুখে এক মহিলার কাছে ভোট প্রার্থনা করতে গিয়ে নির্মল স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেন, ‘দিদি আমাদের একটু দেখবেন?’ তখন কিছুটা ক্ষোভের সুরে মহিলা বলেন, ‘ঘর দিলে দেখব, না হলে দেখব কী করে?’ তাতে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়ে যান গোঘাটের তৃণমূল প্রার্থী। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন আরামবাগের সাংসদ মিতালি বাগ।
স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের ব্যাখ্যা, গোঘাটের বালি, জগৎপুর এলাকায় প্রতি বছরই বন্যা হয়। এলাকার বেশিরভাগ মানুষ চাষবাস করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় অনেকেই মাটির বাড়িতে বসবাস করেন। বন্যায় সেই সব বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁদের কেউ কেউ পাকা বাড়ি তৈরির জন্য ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে সরকারের কাছ থেকে টাকা পেয়েছেন। কারও আবার তালিকায় নাম ওঠেনি। তাঁদেরই কেউ হয়তো প্রার্থীর কাছে তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তা নিয়ে অবশ্য খুব একটা বিচলিত নন তৃণমূলের চিকিৎসক নেতা নির্মল। তাঁর কথায়, ‘জাতপাত, বর্ণ, যাই হোক না কেন, একটাই মন্ত্র শিখেছি দিদির কাছে, সেটা হলো মানুষের সেবা করা। যে যাই বলুক না কেন, উন্নয়ন জিতবে।’
গোঘাটের বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত দিগার এ দিন কুমারগঞ্জের পানপাতায় দ্বিতীয় তারাপীঠে তারা মায়ের কাছে পুজো দিয়ে প্রচার শুরু করেন। কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি যান। দোকানদারদের সঙ্গেও কথা বলেন। নিজেকে এলাকার ভূমিপুত্র দাবি করে সবার কাছে ভোট চাইছেন তিনি। তাঁর কথায়, আমি গোঘাটের ভূমিপুত্র। আর তৃণমূলের যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তিনি তো বহিরাগত। তিনি গোঘাটের কিছুই জানেন না। তৃণমূলের লোকজন আমার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন। কারণ তাঁদের প্রার্থী পছন্দ হয়নি।’