সুপ্রকাশ মণ্ডল
ফাঁকা হয়ে এসেছে হয়তো, তবুও শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড় বলে কথা। রাত সাড়ে ১১টাতেও সব রাস্তাতেই কমবেশি ভিড়। সবাই কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছেন। সেই ভিড়ে মহিলাও ছিলেন কয়েক জন। ভিড় থাকলে কী হবে, বাস তো হাতেগোনা। বিকল্প যানবাহন নেই বললেই চলে। সোদপুরের মাধবী হালদার কোনও বাসই পাচ্ছিলেন না। তখন তাঁকে একজন সন্ধান দেন অদূরের ‘পিঙ্ক বুথ’-এর। কলকাতা পুলিশ রাত-পথে মহিলাদের সাহায্যে যে ‘অ্যাসিস্ট্যান্স বুথ’ চালু করেছে, সেগুলিই পিঙ্ক বুথ। মাধবী সেই বুথে গেলেন এবং ফিরে এলেন। কারণ, বুথ ফাঁকা। শেষ পর্যন্ত কোনও রকমে ডানলপে পৌঁছে সেখান থেকে সোদপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন একলা মহিলা। আর কোনও উপায়ও ছিল না। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁই–ছুঁই।
কলকাতা পুলিশ আপাতত শহরে পাঁচটি ব্যস্ত জায়গায় পিঙ্ক বুথ তৈরি করেছে। শ্যামবাজার ছাড়াও, কাঁকুড়গাছি মোড়, উল্টোডাঙা হাডকো মোড়, বেহালা চৌরাস্তা এবং গড়িয়াহাট মোড়ে তৈরি হয়েছে এই বুথগুলি। এ ছাড়াও রাতের রাস্তায় থাকার কথা প্যাট্রোলিং কারের। নাম ‘শাইনিং’। রাতের রাস্তায় মহিলাদের সাহায্য করার পাশাপাশি তাঁদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করার কথা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে অপসারিত কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার এই ‘পিঙ্ক বুথ’ এবং ‘শাইনিং’-এর সূচনা করেছিলেন মাত্র কয়েক দিন আগেই।
বুধবার রাত সওয়া ১১টা নাগাদ দেখা গেল, শ্যামবাজার মোড়ের পিঙ্ক বুথের সামনে এসে দাঁড়াল পুলিশের একটি গাড়ি। বুথ থেকে দু’জন মহিলা পুলিশকর্মী উঠলেন সেই গাড়িতে। গাড়ি চলে গেল। মাধবী এসেছিলেন আরও খানিক পরে। তারও পরে এসেছিলেন দু’জন। তাঁরা দেখলেন, পিঙ্ক বুথে এক জন সিভিক ভলান্টিয়ার বসে। তিনি বিশেষ কিছু বলতে পারলেন না। এই যদি শ্যামবাজারের ছবি হয়, তা হলে কাঁকুড়গাছির ছবিটা উজ্জ্বল নয়। রাত তখন সবে ১২টা ছাড়িয়েছে। কাঁকুড়গাছি থেকে বাগমারি যাওয়ার রাস্তার পাশের পিঙ্ক বুথ খাঁ–খাঁ করছে।
শ্যামবাজারে তবুও রাত ১২টার কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত রাস্তায় টহলদারি পুলিশের ভ্যান ছিল। ছিলেন জনাকয়েক পুলিশকর্মী। সেই পুলিশকর্মীরা জানান, পিঙ্ক বুথে মহিলা পুলিশকর্মীরা দুপুর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত থাকেন। কাঁকুড়গাছিতে কোনও পুলিশকর্মীই চোখে পড়ল না। যদিও রাস্তায় লোকজন আছেন, তার মধ্যে জনাকয়েক মহিলাও ছিলেন। তাঁদের এক জনের গন্তব্য এয়ারপোর্ট ১ নম্বর গেট, আর এক জনের বিরাটি। দু’জনই হা পিত্যেশ করে দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্যাব ভাড়া করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। শেষ পর্যন্ত ৪৬ নম্বর রুটের একটি বাস এলে দু’জন তাতেই চড়লেন। সে বাসের গন্তব্য এয়ারপোর্ট ১ নম্বর গেট। বিরাটির বাসিন্দা সেখান থেকে কী ভাবে যাবেন, জানেন না।
শ্যামবাজার থেকে হাতিবাগান, সেখান থেকে উল্টোডাঙা হয়ে কাঁকুড়গাছি। সেখান থেকে বেলেঘাটা হয়ে ইএম বাইপাস ধরে যেতে গিয়ে অনেক মহিলাকেই দেখা গেল পথে। তাঁদের কেউ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে, কাউকে দেখা গেল হাঁটতে। কিন্তু কোথাও চোখে পড়ল না ‘শাইনিং’ টিমের গাড়ির। শ্যামবাজারের মোড়ে পিঙ্ক বুথের সাহায্য চেয়ে ফিরে যাওয়া এক তরুণীর মন্তব্য, ‘রাত ১১টায় কলকাতায় তাও কিছু যানবাহন মেলে। অসুবিধাটা হয় আরও বেশি রাতের দিকে। সেই সময়ে যদি পিঙ্ক বুথে পুলিশই না থাকে, তা হলে কী লাভ!’