ভেঙে গিয়েছে পাঁজরের প্রায় সব হাড়। শরীরের অভ্যন্তরের একাধিক অঙ্গতেও গুরুতর আঘাত। দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে হৃদপিন্ড-ফুসফুস। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে ভিসেরা। RG Kar-এ লিফটে আটকে মৃত যুবক অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক ময়নাতদন্তে সামনে এসেছে এমনই ভয়ঙ্কর তথ্য। শুক্রবার সকালে আরজি কর হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করাতে এসে মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যু হয় বছর ৪০-এর ওই যুবকের। লিফটের ভিতরে কী ভাবে এত গুরুতর আঘাত পেলেন দমদমের বাসিন্দা ওই তরুণ, সেই নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। লিফটের দুর্ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক ও হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য অতীন ঘোষ।
বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ছিল অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৪০তম জন্মদিন। ঠিক তার পরের দিনই আহত সন্তানকে সুস্থ করতে এসে ফিরল তাঁর নিথর দেহ। ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে সাংঘাতিক আঘাতের তথ্য। সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, পলি ট্রমায় মৃত্যু হয়েছে ওই যুবকের। তাঁর পাঁজরের সমস্ত হাড় ভেঙে গিয়েছিল। হৃদপিন্ড, ফুসফুস, প্লীহাও ফেটে গিয়েছিল ওই যুবকের। ফেটে গিয়েছিল অন্ত্রও। দেহের ভিতরই সাংঘাতিক রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কী ভাবে এতটা আঘাত লাগল অরূপের, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকালে অরূপ আরজি কর হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে এসেছিলেন চার বছরের ছেলের ফ্র্যাকচারের চিকিৎসা করাতে। গন্তব্য ছিল ট্রমা কেয়ারের পাঁচতলা। অসুস্থ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ২ নম্বর লিফটে উঠতেই ঘটে বিপত্তি। অভিযোগ, পাঁচ নম্বর ফ্লোরের বাটন টিপলেও লিফটে তিন নম্বর ফ্লোর পর্যন্ত উঠে ফের নীচে নেমে আসে এবং সজোরে বেসমেন্টে গিয়ে ধাক্কা খায়। জ্যাম হয়ে যায় লিফটের দরজাও। ভিতরে আটকে পড়েন অরূপ ও তাঁর স্ত্রী ও ছেলে।
অভিযোগ, বহুক্ষণ লিফট আটকে থাকলেও উদ্ধারের জন্য কোনও উদ্যোগ নেননি হাসপাতালের কর্মীরা। RG Kar-এর উপাধ্যক্ষ ও সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়ের কথা অনুযায়ী, ‘তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে সুরক্ষিত ভাবে উদ্ধার করা গেলেও, অরূপকে বের করার সময় ফের লিফট ঝাঁকুনি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই থেমেও যায়। তার ফলে অরূপের বুকে ভয়াবহ আঘাত লাগে। তাঁর নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। উদ্ধারের পরে তাঁকে ওয়ার্ডে নিয়ে এসে চিকিৎসা শুরু করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।’ পরিবার তরফে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে টালা থানায় দায়ের হয়েছে অভিযোগ। টালা থানা আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে আরজি করে লিফ্ট বিভ্রাটকাণ্ডে পাঁচজনকে থানায় তলব করা হয়েছে। লিফ্টম্যান-সহ নিরাপত্তা ও নজরদারির দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের ডেকে পাঠানো হয়েছে বলেই খবর। কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পদক্ষেপ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আরজি করে যান কলকাতা পুলিশের ডিসি (নর্থ) দীনেশ কুমার। যান তৃণমূল বিধায়ক ও হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য অতীন ঘোষও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপরেই দায় চাপিয়েছেন তিনি। তৃণমূল বিধায়ক বলেন, ‘যাঁরা এই সমস্ত ক্ষেত্রে দায়িত্বে আছেন, তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না। লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে পূর্ত দপ্তর ও বিদ্যুৎ দপ্তর। এখানে দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের দায় নিতে হবে।’
এখানেই শেষ নয়, অতীনের কথায়, রোগী কল্যাণ সমিতির আইন অনুযায়ী প্রশাসনে মাথা গলানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। তিনি বলেন, ‘বৈঠক ছাড়া তাই কিছু বলতে পারছি না। সোমবার রোগী কল্যাণ সমিতির জরুরি বৈঠক ডাকতে বলব। এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এটা একেবারেই নজরদারির অভাবের ফল।’ যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য সচেষ্ট হওয়ার কথা বলেন অতীন।