• তলানিতে আলুর দাম, মাঠে নেই ক্রেতা, উৎপাদনের খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন আলু চাষিরা
    এই সময় | ২০ মার্চ ২০২৬
  • আলুর দাম না পেয়ে হাহাকার হুগলির চাষিদের। তিন মাসের পরিশ্রমে ফলানো ফসল এখন যেন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে আলু চাষিদের কাছে। মাঠ থেকে আলু উঠতে শুরু করলেও নেই ক্রেতা, ফলে দাম নেমে এসেছে তলানিতে। চাষিদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলুর থেকে বস্তার দামই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

    কৃষক রনজিৎ ধাড়া বলেন, ‘এ বারে পরিস্থিতি খুব খারাপ। আলু কিনতে মাঠে কেউ আসছে না। এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে যেখানে ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে, সেখানে বাজারে জ্যোতি আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি ৫০ কেজি মাত্র ২০০ টাকায়। চন্দ্রমুখী আলুর দাম প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ৩০০ টাকার আশেপাশে। চাষিদের মতে, অন্তত জ্যোতি আলু ৪৫০-৫০০ টাকা এবং চন্দ্রমুখী ৫৫০-৬০০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হলে কিছুটা সুরাহা মিলত।’

    অন্য বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় হুগলি জেলায় বেড়েছে আলুর উৎপাদন। হুগলি শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের কিষাণ ও খেত মজুর সংগঠনের সভাপতি আব্দুল নাসিম মণ্ডল বলেন, ‘সাধারণত ২৩ থেকে ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও, এ বছর তা বেড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে বাজারে দাম নেই। বর্তমানে মাঠে প্রতি ৫০ কেজির বস্তার দাম ৯০ থেকে ১৮০ টাকা। কিন্তু তাতেও ক্রেতা নেই।’ রাজ্য সরকার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের থেকে ৯৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল দরে আলু কেনার ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি সমবায় হিমঘরে আলু সংরক্ষণের জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং একজন চাষি সর্বোচ্চ ৭০ বস্তা আলু রাখতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া তেমন ভাবে কার্যকর হচ্ছে না বলেই অভিযোগ চাষিদের। অনেক চাষি টোকেন পেলেও নির্দিষ্ট তারিখ পাচ্ছেন না, ফলে আলু সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

    সিঙ্গুরের কৃষক অমলেন্দু ঘোষ বলেন, ‘মাঠে ক্রেতা না থাকায় বাধ্য হয়ে আলু বাড়িতে রাখতে হবে বা হিমঘরে রাখতে হবে। সরকার আলু কিনবে শুনছি , কিন্তু কেউ কিছু এখনো বলেনি।'

    অন্যদিকে, পান্ডুয়ার আলু চাষি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘গত ৪০ বছরে আলুর এমন পরিস্থিতি দেখিনি। আলুর ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু মাঠে কোনও ক্রেতা নেই। চাষি যে আলু হিমঘরে নিয়ে যাবেন, তা তাঁর পক্ষে সেটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। আলুর দাম ১৩০-১৪০ টাকা। হিমঘরে আলু রাখার খরচ বস্তা পিছু ৭০ টাকা। সরকার সহায়ক মূল্যে আলু কিনলেও তার ব্যবস্থাপনা খারাপ।’

    চাষিদের আরও অভিযোগ, বস্তার দাম ৩৫-৩৬ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, যা কালোবাজারির সামিল। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে। অন্যদিকে, গত বছরের ক্ষতির অভিজ্ঞতার কারণে ব্যবসায়ীরাও আলু কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। গত বছর ৬০০ টাকা দরে আলু কিনে ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে তরজা। বিজেপি কিষাণ মোর্চা জেলা সভাপতি সঞ্জয় পান্ডে বলেন, 'চাষিরা যে অভিযোগ করছে তা ন্যায্য। আলু হিমঘরে ভরার জন্য ডেট দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সময় মতো সেখানে ঢোকানো হচ্ছে না। যে কোনও সময় বৃষ্টি হলে আলুর ক্ষতি হবে।

    সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে? এই আলু চাষিরা যে অভিযোগ করছে তা সত্য। এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। আলুর ক্ষতি হলে এর প্রভাব ভোট বাক্সে পড়বে, সেটা শাসক দল বুঝতে পারছে না।' সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আলু চাষিদের ফসলকে বাঁচানোর জন্য আমরা নির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছি। মাঝখানে যে দালালরা রয়েছে তারা চাষিদের ব্যবহার করে তাঁদের টাকা নিজেদের পকেটে ভরছে।’ পান্ডুয়ার এক সমবায় হিমঘরের ডিরেক্টর সত্যজিৎ ঘোষ বলেন , ‘আমাদের সমবায়ের ১ লাখ ৯৯ হাজার আলু রাখার ক্যাপাসিটি রয়েছে। একজন কৃষক ৭০ বস্তা আলু রাখতে পারবে। স্টোরে তার জন্য লাগবে এডিওর স্বাক্ষর। চলতি মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত আলু নেওয়া হবে। সরকার যদি সময়সীমা বৃদ্ধি করে, পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।’

    এই পরিস্থিতিতে চাষিদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, মাঠে পড়ে থাকা আলু যদি বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। অনেক চাষিরই এখন দুশ্চিন্তা, কী ভাবে তারা ঋণ শোধ করবেন। সামগ্রিক ভাবে, উৎপাদন বেশি হলেও সঠিক বাজার ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে হুগলির আলু চাষিরা আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

  • Link to this news (এই সময়)