নির্বাচনী লড়াইয়ে জিতে ফের ক্ষমতায় আসলে জনসাধারণের জন্য কী কী করবে রাজ্য সরকার? তার উত্তর দিতেই শুক্রবার বিকেলে ইস্তেহার প্রকাশ করল তৃণমূল কংগ্রেস। সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১০টি ‘প্রতিজ্ঞা’ তুলে ধরেন। কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো রাজ্যের শাসকদলের তরফে? দেখে নেওয়া যাক একনজরে—
১) লক্ষ্মীর জয়, স্বনির্ভরতা অক্ষয়: বাংলার মা-বোনেদের স্বনির্ভর করতে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু করেছিল সরকার। সম্প্রতি মাসিক আর্থিক সহায়তা আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা মাসে ১,৫০০ টাকা (বার্ষিক ১৮,০০০ টাকা) এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত মহিলারা মাসে ১,৭০০ টাকা (বার্ষিক ২০,৪০০ টাকা) করে সরাসরি সহায়তা পান। এই প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস।
২) যুবদের পাশে, জীবিকার আশ্বাসে: ‘বাংলার যুব-সাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের জীবিকাহীন যুবক-যুবতীদের মাসে ১,৫০০ টাকা (বার্ষিক ১৮,০০০ টাকা) করে আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকবে। যুবকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান ও কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব কমানোর প্রতিশ্রুতি।
৩) বাজেটে কৃষি, কৃষকের হাসি: কৃষক পরিবারগুলির সার্বিক কল্যাণ ও ভূমিহীন কৃষকদের কথা মাথায় রেখে ৩০,০০০ কোটি টাকার এক বিশেষ ‘কৃষি বাজেট’ রূপায়ণের সংকল্প করা হয়েছে।
৪) নিশ্চিন্ত বাসস্থান, চিন্তার অবসান: বাংলা আবাস যোজনা প্রকল্পের অধীনে পাকা বাড়ি করে দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আবাস যোজনায় ১ কোটি ২০ লক্ষ বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। যে সব বাড়ি তৈরি বাকি আছে, সেটাও হবে। আমরা প্রত্যেকের কাঁচা বাড়ি পাকা করে দেব, এটা আমাদের অঙ্গীকার।’
৫) ঘরে ঘরে নল, পরিস্রুত পানীয় জল: মমতা জানান, পূর্বতন সরকারের আমলে ২ লক্ষ মানুষের বাড়িতে পানীয় জল পরিষেবা যেত। বর্তমান সরকারের আমলে সেই সংখ্যা কয়েক কোটি। নির্বাচনে জেতার পরে রাজ্যের প্রতিটি ঘটে পানীয় জল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
৬) সুস্বাস্থ্যের অধিকার, বাংলার সবার: স্বাস্থ্য পরিষেবা এ বার পৌঁছে যাবে ঘরে ঘরে। প্রতিটি ব্লক ও টাউনে প্রতি বছর সরকার আয়োজন করবে ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ শিবির, যাতে হাতের নাগালেই আপনারা পাবেন উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা।
৭) শিক্ষাই সম্পদ, ভবিষ্যৎ নিরাপদ: ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ‘বাংলার শিক্ষায়তন’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত সরকারি স্কুলের সামগ্রিক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করতে তৃণমূল সরকার বদ্ধপরিকর। মমতা জানান, রাজ্য জুড়ে কয়েক হাজার সরকারি স্কুল নতুন মডেলে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি, স্কুলের জন্য নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
৮) পূর্বের বাণিজ্যের কাণ্ডারী, বাংলায় দিশারী: পূর্ব ভারতের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বাংলাকে গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশ্বমানের লজিস্টিকস, বন্দর, বাণিজ্যিক পরিকাঠামো এবং একটি অত্যাধুনিক গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার তৈরির মাধ্যমে বাংলাকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার শ্রেষ্ঠ গন্তব্য করে তোলা হবে।
৯) প্রবীণদের পাশে, যত্নের আশ্বাসে: প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা সরকারের পবিত্র কর্তব্য। বর্তমান সকল উপভোক্তার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বার্ধক্য ভাতার সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ধীরে ধীরে এই ভাতার সুরক্ষা পরিধিকে আরও সম্প্রসারিত করে সকল যোগ্য প্রবীণ নাগরিককে এর আওতায় নিয়ে আসা হবে।
১০) এ ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনকে আরও নিবিড়ভাবে পৌঁছে দিতে ৭টি নতুন জেলা তৈরি করা হবে এবং সামগ্রিক ভৌগোলিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরসভার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
ইস্তেহার প্রকাশের আগে রাজ্যের একাধিক আমলা, পুলিশকর্তাদের বদলি নিয়ে ফের নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কার্যত ‘অঘোষিত নয়, ঘোষিত প্রেসিডেন্ট রুল’ জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মমতা বলেন, ‘বাংলা যদি বাঁচাতে হয়, সব মানুষ এক সঙ্গে থাকতে হলে, শান্তি, সম্প্রীতি রক্ষা করতে হলে বিজেপি-কে এমন শিক্ষা দিন, কেন্দ্রীয় এজেন্সি ভয় দেখালে শুনবেন না।’
কমিশনের পাশাপাশি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপিকেও একহাত নেন মমতা। নির্বাচনের আগে অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে ভোটে জেতার চেষ্টা করবে বিজেপি, আশঙ্কা মমতার। তাঁর কথায়, ‘টাকার প্রলোভনে পা দেবেন না। আইএএস, আইপিএস-দের বদলেছে, বর্ডার থেকে টাকা ঢোকাবে বলে, বন্দুক, মাফিয়া টাকা ঢোকাচ্ছে। হিংসা করার চক্রান্ত করছে। জোর করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে ইতিমধ্যে। মুখে বলছে না। করেছে। বাংলার মানুষকে আঘাত করলে তারা প্রত্যাঘ্যাত করতে জানে।’