সুমন তেওয়ারি, চুরুলিয়া (জামুড়িয়া): চুরুলিয়ার মাটিতেই ভূমিষ্ট হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সম্প্রীতির কবি লিখেছিলেন বহু শ্যামাসঙ্গীতও। সুরারোপ করেছিলেন অসংখ্য গানে। সেই চুরুলিয়ায় ভোট চাইতে এসে চরম অস্বস্তির মুখে পড়লেন জামুড়িয়ায় বিজেপি প্রার্থী বিজন মুখোপাধ্যায়। তাঁকে শুনতে হল—‘আপনাদের নেতা তো বলেই দিয়েছেন মুসলিমদের চ্যাংদোলা করে ছুড়ে ফেলে দেবেন। তিনি আবার রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি একথা বলেছিলেন।’
বিজনবাবু জামুড়িয়ার নামকরা চিকিৎসক। বৃহস্পতিবার চুরুলিয়ায় এসেছিলেন পদ্ম-প্রতীকে ভোট চাইতে। তখন তেঁতুলতলায় বসেছিলেন আলাউদ্দিন শা। বিজনবাবু হাত মেলাতেই তিনি ক্ষোভ উগরে দেন ওই ক’টা কথা বলে। বেশ অস্বস্তিতে পড়ে যান বিজেপি প্রার্থী। ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে গিয়ে বলেন, ‘আরে বাবা, আমি বিজপুরের ডাক্তার। আপনি আমার কথা শুনবেন নাকি ওঁর কথা শুনবেন।’ আলাউদ্দিন সাহেবও পাল্টা শুনিয়ে দেন,‘আমাদের তো ওঁর কথা শুনতেই হবে। উনি আমার আপনার সবার বিরোধী দলনেতা। তখন তো ওঁর কথার কেউ প্রতিবাদ করেননি।’ বিদ্রোহী কবির ভিটেয় এহেন ‘বিদ্রোহ’ দেখে এলাকা ছাড়লেন বিজনবাবু।
জামুড়িয়া বিধানসভার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত। একদা এখানে প্রশ্নাতীত প্রভাব ছিল সিপিএমের। এখনও ১৪ সদস্যের গ্রাম পঞ্চায়েতে চারজন সিপিএম সদস্য রয়েছেন। পঞ্চায়েতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তৃণমূলের। লোকসভা, বিধানসভা ভোটেও এই পঞ্চায়েত থেকে লিড পেয়েছে শাসকদল। তা সত্বেও এলাকার বেনিয়ম নিয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে তারা। দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর হওয়ার পরও এলাকায় পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়নি। তৃণমূলের দেওয়াল লিখনও চোখে পড়েনি। এই সুযোগে তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কে সিঁদ কাটতে এদিন পৌঁছে যান বিজেপি প্রার্থী। বিদ্রোহী কবির মূর্তিতে মাল্যদান করে জনসংযোগে নামেন। প্রথমেই যান সিপিএম সমর্থকদের কাছে। তাঁদের হাত ধরে প্রার্থীর আর্জি, ‘একটিবার সুযোগ দিন। আমি গাইনোর ডাক্তার। এখানে বহু রোগী আমার কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন।’ তারপরই বাইকে করে কিছুটা যেতেই তেঁতুলতলায় বহু মানুষ বসে থাকতে দেখে নেমে পড়েন বিজনবাবু। সেখানেই ক্ষোভ প্রকাশ করে আলাউদ্দিন সাহেব। পরিস্থিতি কোনওরকমে সামলে যান হাটতলায়। কাজী নজরুল ইসলামের আরও একটি মূর্তিতে মাল্যদান করেন বিজেপি প্রার্থী। তখন দলীয় কর্মীরা আওয়াজ তোলেন, ‘কবিগুরু লহ প্রণাম।’ শুনে হাসাহাসি করেন স্থানীয়রা। আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুলের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলেন বিজেপি কর্মীরা। বিজনবাবু অবশ্য এই প্রথম রাজনীতির ময়দানে নামেনি। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে রানিগঞ্জ থেকে বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়েছিলেন। পরাজিত হন। এবার দল তাঁকে জামুড়িয়া আসনে টিকিট দেন।
এদিন হাটতলা বাজারে সব্জি কিনছিলেন অঞ্জনা বাদ্যকর। বিজনবাবু তাঁর কাছে অনুরোধ করেন বিজেপিকে ভোট দিতে। অঞ্জনাদেবী পাল্টা জানিয়ে দেন, ‘বিজেপি কী দিয়েছে যে ভোট দেব?’ তখনই চিকিৎসক প্রতিশ্রুতির দিয়ে বলেন, আমরা ক্ষমতায় এলে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে তিন হাজার টাকা করে পাবে।’ কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়েছিলেন রাখাকুড়িয়ার সিরাজুল। প্রার্থীকে হাতের কাছে পেয়ে তিনি বলেন, পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি প্রার্থী হয়েছিলাম। ভোটে হেরে যাওয়ার পর বাড়িঘর ভাঙচুর করল। গ্রাম ছাড়া হলাম। দলের কেউ খোঁজ রাখেনি। পার্টি করে কী হবে’