শুভাশিস সৈয়দ, জলঙ্গি
বাড়ি থেকে ১০ কিমি দূরের স্কুলে যাতায়াতের পথে ন'বছরের এক পড়ুয়া দেখেছিল, তার চেয়ে বয়সে ছোট বেশ কয়েকটি খুদে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা নোংরা-আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক, বোতল ভাঙা সংগ্রহ করছে। মূলত আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া বলে তারা তার মতো পড়াশোনা করতে পারছে না — এই ভাবনা ঝড় তোলে শিশুমনে। তাদের পড়ানোর কথা ভাবে সে। আর যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা (Beldanga of Murshidabad) থানার ভাবতা এলাকার শঙ্করপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবর আলি মাত্র ন'বছর বয়সে নিজের বাড়ির উঠোনে পেয়ারা গাছের নীচে 'আনন্দ শিক্ষা নিকেতন' স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এলাকার গরিব ঘরের ন'জন খুদে পড়ুয়া নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০০২ সাল সেটা। এর পরে বিবিসি মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁকে 'বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নানা রাজ্যের পাঠ্যপুস্তকে ঠাঁই পেয়েছে বাবর আলির জীবনী।
সেই মানুষটিকেই এ বারের বিধানসভা ভোটে প্রার্থী করেছে তৃণমূল (TMC)। গত মঙ্গলবার সকালে বহরমপুর জেলা তৃণমূল কার্যালয়ে জোড়াফুলে যোগ দেন তিনি। আর তার কয়েক ঘণ্টা পরেই জলঙ্গি কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। বাবর বলেন, 'আমার ছোট বোন আমিনা খাতুন-সহ মোট আট জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে আমার স্কুল শুরু হয়েছিল। প্রতি দিন বিকেলে তিন ঘণ্টা ধরে একটি পেয়ারা গাছের নীচে আমরা এক সঙ্গে বসে পড়তাম, যাতে ওরা সকালে আবর্জনা কুড়োনো বা বিড়ি বানানোর কাজ চালিয়ে যেতে পারে।' স্কুলে পড়ার সময়েই বাবর তাঁর স্কুল থেকে ব্যবহৃত চকের টুকরো সংগ্রহ করে আনতেন এবং সেই চক দিয়ে বোর্ডে তাঁর খুদে ছাত্রছাত্রীদের বাংলা লেখা ও অঙ্ক শেখানোর পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং ভূগোল পড়াতেন।
বাবরের কথায়, 'স্কুলের শিক্ষকরা ভাবতেন আমি দেওয়ালে আঁকিবুঁকির জন্য চক চুরি করছি। কিন্তু যখন তাঁরা জানতে পারলেন যে, আমি বাড়িতে অন্য বাচ্চাদের শেখাচ্ছি, তখন তাঁরা আমাকে প্রতি সপ্তাহে এক বাক্স চক দিতে শুরু করলেন।' মা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী বানুয়ারা বিবি এবং পাট ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন— দু'জনেই ছিলেন স্কুলছুট। কিন্তু এলাকার খুদে পড়ুয়াদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন পূরণে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেন তাঁরা। খোলা আকাশের নীচের সেই পাঠশালা এখন তিন তলা স্কুল। এর মধ্যে বাবর ইংরেজি ও ইতিহাসে ডবল এমএ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। এলাকার মানুষ এখনও তাঁকে খুদে মাস্টার বলেই চেনেন।
‘আমি পার্টিম্যান...’ বহরমপুরে প্রার্থী তিনিই, জানিয়ে দিলেন অধীরবাবর বলেন, 'আমি শিক্ষা জগতের মানুষ। আচমকা এক দিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন পেয়ে আমি চমকে যাই, তবে খুশিও হই। পরে দেখা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।' সীমান্ত লাগোয়া জলঙ্গি বিধানসভা কেন্দ্রে হাসপাতাল ও দমকল কেন্দ্র গড়ে তোলা, পানীয় জলের সমস্যা মেটানো ও শিক্ষার উন্নয়নই তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বাবর আলি।