• তৃণমূলের ইস্তেহারে ‘দুয়ারে চিকিৎসা’র পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি শিল্প–বিদ্যুৎ–কর্মসংস্থান নিয়ে
    এই সময় | ২১ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ আগেই নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সরকার। এখন রাজ্যে চালু আছে ‘দুয়ারে সরকার’ ও ‘পাড়ায় সমাধান’–এর মতো প্রকল্প। এ বার স্বাস্থ্য পরিষেবাও মানুষের বাড়ির দরজায় পৌঁছে দিতে চান তৃণমূল (Tmc) নেতৃত্ব। ফের ভোটে জিতে এলে সে রকমই পরিকল্পনা তাঁদের।

    ২০২৬–এর বিধানসভা ভোটের (2026 assembly elections) নির্বাচনী ইস্তেহার শুক্রবার প্রকাশ করেছে তৃণমূ‍ল। সেখানে নানা বিষয়ে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অভাব–অভিযোগ মেটানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইস্তেহারে। তবে তার মধ্যে রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত তৃণমূলের প্রতিশ্রুতি। এমনিতে রাজ্য সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প’ যথেষ্ট জনপ্রিয় বলে বারবার দাবি করেন তৃণমূল নেতৃত্ব। তার পরেও রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে কিছু অভিযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছেন না মুখ্যমন্ত্রী। সে কারণেই স্বাস্থ্য পরিষেবাকে মানুষের দরজায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি এ দিন মমতা দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা। ইস্তেহারে বলা হয়েছে, ‘রাজ্যের প্রতিটি ব্লক এবং শহরে বার্ষিক দুয়ারে চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করা হবে। এবং প্রতিটি ব্লক স্তরের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান তৈরি হবে।’

    ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ শিবিরে কী ধরনের পরিষেবা মিলবে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইস্তেহারে লেখা হয়েছে, ‘উন্নত মানের স্বাস্থ্য পরিষেবা, কেস–বাই–কেস রেফারেন্স, ওষুধ এবং একটি সুনির্দিষ্ট রোগী ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরবর্তী চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। যাতে একজন রোগীও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।’ এই ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ প্রকল্পের সঙ্গে অনেকেই সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ মডেলের। ডায়মন্ড হারবার লোকসভার প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি নিয়মিত ‘সেবাশ্রয় ক্যাম্প’ করেন। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মতে, অভিষেকের দেখানো সেই স্বাস্থ্য পরিষেবার পথে হেঁটেই তৃণমূল সরকার আরও জনপ্রিয় করতে তুলতে চাইছে বাংলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে। এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য সাথী আছে। অনেক মেডিক্যাল কলেজ আছে। মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল আছে। কয়েক হাজার সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এ বার প্রত্যেক বছর প্রতি ব্লকে, প্রতি টাউনে দুয়ারে স্বাস্থ্য ক্যাম্প হবে।’

    মুখ্যমন্ত্রী এই ঘোষণা করার সময়ে পাশেই ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। পরে তিনি এক্স হ্যান্ডল পোস্টে লেখেন, ‘বাংলা চিরকালই দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছে— পথ চিনেছে, সে পথে হেঁটেছে এবং পথ দেখিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০টি ‘প্রতিজ্ঞা’-তেও সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে, যা বাংলার মানুষের বাস্তব জীবন, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত।’ তাঁর সংযোজন, ‘নারী, যুবসমাজ, কৃষক ও প্রবীণদের সম্মান ও সুযোগ দিয়ে ক্ষমতায়ন থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি ও পরিস্রুত পানীয় জল সুনিশ্চিত করা, ‘দুয়ারে চিকিৎসা’-র মাধ্যমে দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা সরকারি স্কুলগুলির আধুনিকীকরণ— এই রূপরেখায় মিলেমিশে রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মানবিকতা।’

    রাজ্য সরকারের জনপ্রিয় প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। সেই খাতে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ভোটের আগেই বাড়িয়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার। ভোটের পরে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে সেই বর্ধিত অর্থই চালু থাকবে বলে এ দিন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল সরকারের এই প্রকল্পকে ‘কাউন্টার’ করতে বিজেপি নেতারাও মহিলাদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করেছেন। মমতার সরকার বর্তমানে এই প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের মাসিক দেড় হাজার টাকা করে দেন। বিজেপি নেতারা তার দ্বিগুণ দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। সূত্রের খবর, বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহারেও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’ তিন হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদানের প্রতিশ্রুতি থাকবে। যা আঁচ করে মমতা এ দিন বলে‍ন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বৃদ্ধি আমরা ইতিমধ্যেই করে দিয়েছি। যদি কেউ বলে আমরা করব, তারা ভোটের সময়ে বলবে, কিন্তু পরে বাস্তবায়িত করবে না। আমরা কিন্তু ভোট ঘোষণা হওয়ার একমাস আগেই করে দিয়েছি।’

    এ বারের বিধানসভা ভোটে বিজেপির প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি। গেরুয়া শিবিরের দাবি, তারা এ বার ক্ষমতায় এলে বাংলায় শিল্প নিয়ে আসবে। তাতে কর্মসংস্থান বাড়বে। এমনকী, ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরাও বাংলায় ফিরে আসতে পারবেন। যার জবাব দিতে গিয়ে মমতা বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা দু’কোটি ছেলেমেয়েকে চাকরি দিয়েছি। মোদী সরকার বলেছিল, প্রতি বছর দু’কোটি চাকরি দেওয়া হবে। ভারতে ৪০ শতাংশ বেকারি বেড়েছে। বাংলায় ৪০ শতাংশ বেকারি কমেছে। দেশে দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এখানে কমেছে।’ এরপরেই তাঁর আশ্বাস, ‘বাণিজ্যের কান্ডারি বাংলাই দিশারী। ইতিমধ্যেই কয়েক লাখ কোটি টাকার প্রজেক্ট এসেছে। ডেউচা–পাঁচামি হয়ে গেলে আগামী একশো বছর বিদ্যুতের জোগানে কোনও সমস্যা হবে না।’

    তাঁর ব্যাখ্যা, ‘জোগান বাড়লে দাম কমে। দাম কমলে শিল্প আসে। রঘুনাথপুরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আমরা দেশে এক নম্বর। এই সেক্টরে বাংলার দেড় কোটি ছেলেমেয়ে কাজ করে।’ তৃণমূলের ইস্তেহারে শিল্প সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিতে লেখা হয়েছে, ‘২০৩০–এর মধ্যে বাংলায় নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ৩ লক্ষে এবং কারখানার সংখ্যা ১১ হাজারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।’

    এর সঙ্গে রাজ্যের ছ’টি শিল্প ও অর্থনৈতিক করিডরের সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে ইস্তেহারে। তৃণমূল চাইছে, দেশের অন্যতম লজিস্টিক হাব হিসেবে বাংলাকে পৌঁছে যেতে। শিক্ষাক্ষেত্রেও আধুনিকীকরণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে তৃণমূলের ইস্তেহারে। এ প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘আমরা টার্গেট করেছি, কয়েক হাজার স্কুল আমরা অধুনীকিকরণ করব। তার জন্য শিক্ষক নিয়োগ হবে। আমরা তো শিক্ষক নিয়োগ করতে চাই। কিন্তু বিরোধীরা রাজনৈতিক লড়াইয়ে পারে না, আদা‍লতে গিয়ে মামলা ঠুকে দেয়। আর কোর্টে কেস মানেই ভাগ্য ঝুলে রইল। তাতে বিরোধীদের মুখে হাসি ফোটে। বোঝে না, এতে মানুষ কষ্ট পায়। আমরা শিক্ষকদের পক্ষে। ওরা নয়।’

    এই ইস্তেহার নিয়ে অভিষেক বলেছেন, ‘শিল্পায়নে জোর ও উন্নত প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে এটি এক প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনও কল্পনা নয়, বরং মানুষের সঙ্গে নিরন্তর জনসংযোগের ফসল। যিনি বাংলার কল্যাণে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁর হাত শক্ত করে এই প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন আমাদের সকলের যৌথ দায়িত্ব।’ যদিও এই ইস্তেহারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘এটা কোনও ইস্তেহার নয়। মিথ্যে কথার ফুলঝুরি। তৃণমূল সরকার এতদিন দুয়ারে বোমা, গুলি নিয়ে এসেছে। এখন ভোটের মুখে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। মানুষ আর তৃণমূলকে দুয়ারে ঘেঁষতে দেবে না। বাংলায় বিজেপির সরকারই আসছে।’

  • Link to this news (এই সময়)