এই সময়, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: রাজনৈতিক চাপানউতোর, প্রশাসনিক চিঠিচাপাটি চলছিলই বেনজির বদলি–নির্দেশিকা নিয়ে। বাংলায় নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যের ৪৩ জন আমলা ও পুলিশকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনার রেশ এ বার গড়াল আদালত পর্যন্ত। দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) (Election Commission) যে ভাবে গত কয়েক দিনে একের পর এক আমলা–পুলিশকে সরিয়ে দিয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করে শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের (High Court) প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হলো। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে।
গত রবিবার রাজ্যের নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশের পরপরই মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, কলকাতার সিপি–সমেত ৪৩ জন শীর্ষ অফিসারকে সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। অপসারিত অফিসারদের আবার বিকল্প পোস্টিং দিয়েছে নবান্ন। সেই অফিসারদের অনেককে আবার ভিন রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে কমিশন পাঠাচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে অপসারিত বা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া অফিসারের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যাবে। কমিশনের এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে এ দিন হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রাজ্যের বর্ষীয়ান আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মামলা দায়েরকারী হিসেবে নাম রয়েছে অর্ক নাগের, যিনি রাজ্য সরকারের জুনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল হিসেবে কর্মরত।
মামলাকারীর যুক্তি, এই ঢালাও বদলি ও তার সময়কাল অভূতপূর্ব! যা নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যত ভেঙে দিতে করা হয়েছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার নামে এই পদক্ষেপ করা হলেও, বাস্তবে তা স্বেচ্ছাচারী, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। এমনকী, এই বদলি রাজ্য সরকারের উপরে প্রতিশোধমূলক বলেও মন্তব্য করা হয়েছে মামলায়। আবেদনে আরও বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার ব্যাপারে তৃণমূল তৎপর হওয়াতেই চাপে ফেলতে এই ব্যাপক প্রশাসনিক রদবদল করা হয়েছে। এটা রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ও জনপরিষেবার উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতগুলি বদলি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক চিঠি দিয়েছেন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে। বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগ তোলেন, রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি বা কার্যত রাষ্ট্রপতি শাসন কার্যকরের জন্য এ ভাবে ঘুরপথে চেষ্টা করা হচ্ছে। এ দিন ফের তিনি আক্রমণ শাণিয়েছেন কমিশনকে। পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও একাধিক বিরোধী দল একসুরে তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছে। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (আপ), ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রধান তথা জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং শিবসেনার (উদ্ধব) সঞ্জয় রাউতও।
এ দিন মমতা বলেন, ‘যে অফিসারদের সরাচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি কী? মানুষ রেশন পাবে কী করে? বন্ধ হয়ে গেলে আমার কোনও দোষ নেই। খাদ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে পর্যবেক্ষক করে নিয়ে গিয়েছে। পঞ্চায়েত দপ্তরের অফিসারদের পর্যবেক্ষক হতে বলছে!’ তাঁর বক্তব্য, ‘ভিন রাজ্যের লোক কি বাংলা চেনে? তারা এখানকার সংস্কৃতি চেনে না। মানুষ চেনে না। এরপরে যদি কোনও ঘটনা ঘটে, তা হলে দায়ী থাকবে বিজেপি সরকার।’ এ দিন ফের তাঁর অভিযোগ, ‘এখানে কার্যত ঘোষিত ভাবেই রাষ্ট্রপতি শাসন করে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি শাসন করে মোদীদজিকে নির্বাচন করতে হচ্ছে! বাংলার মানুষকে এত ভয়। মোদী সরকার সব কিছু বেলাইন করে দিয়েছে। বিচারের সব জায়গা কিনে নিয়েছে। জুজুর ভয়, নয় লোভ—এই দুটো জিনিস দেশে কাজ করছে। ওদের এই স্পর্ধাকে বাংলার মানুষই জব্দ করে দেবে।’
দিল্লিতে বিরোধী শিবির সূত্রের দাবি, আগামী সপ্তাহে সংসদের বাজেট অধিবেশনে এই ইস্যুতে তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়ে সরব পারে বিরোধী দলগুলি৷ লোকসভায় তৃণমূলের ডেপুটি লিডার শতাব্দী রায় বলেন, ‘বিরোধী শিবিরের নেতারা সবাই বুঝতে পারছেন যে নির্বাচন কমিশন কেমন আচরণ করছে৷ তাই তাঁরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রতিবাদ করছেন৷’ এক্স হ্যান্ডলে ওমর আবদুল্লা লিখেছেন, ‘এই ভাবে গণহারে বদলি শুধু বিজেপি শাসিত নয় এমন রাজ্য বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে হয়ে থাকে৷ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ পশ্চিমবঙ্গ আবারও প্রমাণ করবে, অফিসাররা কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য কাজ করেন না, তাদের নির্বাচনে জেতান না৷ কমিশনের কোনও চেষ্টাই ভোটের ফল বদল করতে পারবে না৷ ভোট গণনার দিন মমতাদিদি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই জিতবেন৷’ শিবসেনার (উদ্ধব) সাংসদ সঞ্জয় রাউতের প্রশ্ন, ‘অন্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে এতজন আমলা-পুলিশ অফিসারদের বদলি করা হয় না কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিজেপি হারাতে পারবে না৷ এই কারণেই ওরা পুরো বাংলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করছে৷’ যদিও রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই সরকারটা যে চলে যাচ্ছে, এটা নিয়ে কোথাও কোনও সংশয় মানুষের মধ্যে নেই। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু কী বলছেন, তা নিয়ে কারও কোনও আগ্রহও নেই। বাংলার মানুষ তৃণমূল সরকারকে সরিয়ে বিজেপির সরকারকে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।’