• কলতানের উঠোনে হামাগুড়ি দেয় ‘দ্রোহ’, আধো বুলিতে কথা বলে!
    এই সময় | ২১ মার্চ ২০২৬
  • রূপক বসু

    সে সময়ের নাম হয়েছিল ‘দ্রোহকাল’। অভয়া আন্দোলনের সেই অশান্ত সময়। রাত দখলের হুঙ্কার, ব্যারিকেড ভাঙা, অবস্থান, বিক্ষোভ, গ্রেপ্তারি আরও কত কী! তার পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আন্দোলনের তেজও গেল কমে। অনেকেই মনে করেন, এখনও ন্যায়বিচার পাননি না অভয়া। তার মধ্যেই বাংলায় বাজল ভোটের ঘণ্টা। ভোটের আবহে অভয়ার মা বিজেপির (BJP) প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করে ফেলেছেন। তবে শুধু অভয়ার বাড়িতেই নয়, সেই দ্রোহের আগুন খুব যত্ন করে নিজের বুকে জ্বালিয়ে রেখেছেন আরও একজন। কলতান দাশগুপ্ত। তিনিই অভয়ার বাড়ির এলাকা, পানিহাটি বিধানসভা (Panihati Assembly) কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী।

    ঘটনাচক্রে বৃহস্পতিবারই অভয়ার মা টেনে এনেছিলেন কলতানের প্রসঙ্গ। জানিয়েছিলেন, ক’দিন আগেই বাম প্রার্থী তাঁদের বাড়িতে আসেন। অভয়ার মায়ের কথায়, ‘কলতানকে আমরা বলেছিলাম, ওঁদের মতো করে প্রচার করতে। আমার মেয়েকে যেন প্রচারে ব্যবহার না করা হয়। তবে বাস্তবে দেখা গেল, ২০২৪–এর ৯ অগস্টের সেই ভিডিয়ো ফের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে ভোট চাইছেন ওঁরা।’ পানিহাটির তৃণমূল প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর। অভয়ার দেহ তড়িঘড়ি দাহ করতে উদ্যোগী হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল নির্মলের বিরুদ্ধে।

    আরজি কর হাসপাতালে (R.G.KAR HOSPITAL) অভয়ার নিথর দেহ নিয়ে বেরোনো অ্যাম্বুল্যান্স আটকানো ডিওয়াইএফআই কর্মীদের দলে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন কলতানও। তার পরে আন্দোলনের স্রোত নানা বাঁকে বয়েছে। অনেকে মিশেছেন সেই স্রোতে। অভয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এক ফোনালাপের অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কলকানকে। তাঁর স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা। হাজতবাসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায় প্রথমবার বাবা হওয়ার সেই অনুভূতি।

    সেই মুহূর্ত থেকে বেরোতে চাননি কলতান। বয়ে নিয়ে চলেছেন সেই অনুভূতি। সেই ‘দ্রোহকাল’–এর সঙ্গে নিজের জীবন মিশিয়ে ফেলেছেন তিনি। দ্রোহের আবহে জন্ম নেওয়া নিজের মেয়ের নাম রেখেছেন দ্রোহজা। কলতানের স্মৃতিতে উঠে এলো মেয়ের নামকরণের প্রসঙ্গটা। তাঁর কথায়, ‘নামটা সাজেস্ট করেছিল আমাদেরই এক কমরেড। আমরাও এমন একটা নাম খুঁজছিলাম। দ্রোহজা হলো দ্রোহের সময়ের জাতক।’ হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার ছ’দিন পরে জন্ম নেয় মেয়ে। বাবা হওয়ার আগে আনন্দ আর উৎকণ্ঠার অনুভূতিগুলো গরাদের ও পারে বসে একাকী কাটাতে হয়েছিল। কী মনে হতো তখন? এমনিতে সব সময়েই মুখ থেকে হাসি ঝোলে কলতানের। বললেন, ‘সব কী আর মনে আছে। তবে বই পড়ে অনেকটা সময় কাটত। উৎকণ্ঠা তো ছিলই। শুনেছি মা আর স্ত্রী সেই সময়ে খুব শক্ত ছিল। ওদের লড়াইটা কিছু কম ছিল না।’

    মেয়ে, স্ত্রী, অসুস্থ মা–কে নিয়ে সংসার সিপিআইএম–এর হোলটাইমার কলতানের। প্রচারের কাজে এখন বাড়ি ছেড়ে পড়ে রয়েছেন পানিহাটিতে। প্রথমবার বিধানসভায় প্রার্থী হওয়ার আলাদা কোনও অনুভূতি নেই? কলতানের জবাব, ‘প্রতিবারই তো ভোটে লড়াই করি। তখন মিছিলের মধ্যে থাকতাম, এখন প্রার্থী হয়ে সামনে আছি, পার্থক্যটা এ টুকুই।’ এর আগে নির্বাচনে লড়ার অভিজ্ঞতা বলতে সাউথ সিটি কলেজে এসএফআই–এর হয়ে সিআর ইলেকশন। তবে এ লড়াই অন্য রকম, সেটা জানেন ডিওয়াইএফআই–এর মুখপত্রের প্রাক্তন সম্পাদক। জানেন, এই লড়াই সেই আগুনে সময়েরও, যা তাঁকে আলাদা প্রেরণা দেয় তাঁকে। পানিহাটি থেকে ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাট। দ্রোহ যে জড়িয়ে আছে কলতানের জীবনে। সেই দ্রোহই তো কলতানের উঠোনে হামাগুড়ি দেয়, কথা বলে আধোস্বরে।

  • Link to this news (এই সময়)