ছরের বাকি নমাজ বাড়িতে কিংবা মসজিদে পড়লেও, এক জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বছরে দু’বার ইদের সময় বৃহত্তর মুসলমান জনতার সঙ্গে নমাজ পড়ে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করেন। কলকাতার মতো শহরে সেই বিশাল সমাবেশ মসজিদ চত্বর ছাড়িয়ে, সর্বজনীন স্থান থেকে ময়দান পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে যায়। বিশ শতকের প্রথম দিকে ইদের দিনে কলকাতার ধর্মতলা অঞ্চলে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের সেই বিশাল জমায়েত দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন বাগদাদ থেকে আসা এক পর্যটক। অ্যাথানাসিয়োস ইগনেশিয়াস নুরি নামে এই সিরীয় খ্রিস্টান ধর্মযাজক খেয়াল করেছিলেন যে, সেই সময় কলকাতা শহরের মসজিদগুলিতে উঁচু মিনার দেখা যেত না। মুয়াজ্জিনরা মসজিদের ছাদ বা চাতাল থেকে আজান দিতেন। হয়তো প্রশাসনিক অনুমতির বাধায় মিনার তৈরি হয় না— নুরি এমন আন্দাজ করলেও, আসলে এর সম্ভাব্য কারণ ছিল বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব।
সাহিত্যিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, ইদ মানে আনন্দ, আনন্দ-দিবস বা পরবের দিন। ইমানদার ধর্মনিষ্ঠ মুসলিমদের ইদুল ফিতরের আনন্দোৎসব করার বিশেষ একটা কারণ আছে। এক মাস ধরে সুখে-দুঃখে, শারীরিক-মানসিক কৃচ্ছ্রের ভিতর দিয়ে গিয়ে উপবাস করাটা সহজ কাজ নয়— কঠিন শারীরিক পীড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যত্যয় অবশ্য আছে। তাই যে মুসল্লি পূর্ণ ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিন শরিয়তের আদেশমতো উপবাস করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁর মনের আনন্দ স্বাভাবিক ভাবেই সর্বাধিক হয়।
এই আনন্দযজ্ঞের উপকরণ হিসেবে গত শতকের প্রথম দিকে বাংলা থিয়েটারপাড়ায় ইদ-সহ মুসলমানদের অন্যান্য পরবের দিনে ‘বিশেষ রজনী’ আয়োজিত হত। এর বেশির ভাগই ছিল মুসলমানি নাটক। কিন্তু এক বার স্টার থিয়েটার ‘মুসলমান ভ্রাতৃগণের বিশেষ অনুরোধে’ বিজ্ঞাপন দিয়ে কর্ণার্জুন নাটকের আয়োজন করেছিল। প্রচুর মুসলমান দর্শক এসেছিলেন নাটকটি দেখতে। কেবল পৌরাণিক নাটক বলেই নয়, ‘দেখবার জিনিস’ আছে বলে। অহীন্দ্র চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, থিয়েটারের দৃশ্য পরিবর্তনের কাজে নিযুক্ত থাকতেন বেশ কিছু ঘরামি শ্রেণির বাঙালি মুসলমান। তাঁদের বলা হত ‘সিফটার’। নাটকের কোনও দৃশ্যের দর্শক গ্রহণযোগ্যতা বুঝতে অনেক সময় স্বয়ং গিরিশচন্দ্র ঘোষ পর্যন্ত এই সিফটারদের মতামত নিতেন।
ওয়াজিদ আলি শাহ লখনউ থেকে কলকাতায় আসার পর শহরের উৎসব-মানচিত্রে উঠে এল মেটিয়াবুরুজের নাম। নবাবের পৃষ্ঠপোষকতায় মহরমের জাঁকজমকের কথা বহু আলোচনায় উঠে এসেছে, তবে তিনি ইদেও কম আড়ম্বর করতেন না। এক বার মুর্শিদাবাদের নবাব আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এই উদ্যাপনে। ‘ছোটা লখনউ’য়ে শিয়া ধর্মাবলম্বীদের ‘সোহবত’ নামে বিশেষ সভা ইদের দিন থেকে শুরু হয়ে বেশ কিছু দিন ধরে চলার কথা লিখেছেন আব্দুল হলীম শরর্। এত আয়োজনের ফলেই হয়তো রোজার মাস রমজান শেষের এই ইদকে বলা হয় ‘মিঠি ইদ’, মিষ্টি ঈদ। এই নামে হালুয়া আর সেমাইয়ের অনুষঙ্গের সঙ্গে মিশে থাকে সদাচার, সম্প্রীতি, সৌভ্রাত্রের সুবাস। ছবিতে চিৎপুরে ইদের কেনাকাটায় শিশু।
সার্ধশতবর্ষে
“তোমার লেখনী বাঙালীর চিত্ততন্তুকে হাসি ও অশ্রুর নবতর ও গভীরতর ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত করে তুলেছে,” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (ছবি) উদ্দেশে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে আশীর্বাণী মিথ্যা হওয়ার নয়; বাংলা সাহিত্যের জ্যোতিঃশিখায় যে দীর্ঘায়ু সঞ্চার করেছেন অমর কথাশিল্পী, ইতিহাসই প্রমাণ তার। এ বছর সেপ্টেম্বরে সার্ধশতবর্ষ পূর্ণ হবে শরৎচন্দ্রের, বছরভর নানা পত্রপত্রিকা, প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠান উদ্যাপন করে চলেছে এই মাইলফলক, যোগ দিয়েছে ২৪ অশ্বিনী দত্ত রোডে শরৎচন্দ্রের বাসভবন-স্থিত ‘শরৎ সমিতি’ও। আগামী ২৫ মার্চ বুধবার দিনভর সেখানে ‘সার্ধশতবার্ষিক আলোচনাচক্র’; সকাল ১০টায় প্রারম্ভিক পর্বে বলবেন পবিত্র সরকার ও রামকুমার মুখোপাধ্যায়, সূচক ভাষণে শ্রাবণী পাল। পরবর্তী তিনটি অধিবেশনে শরৎ-সাহিত্যের বিষয় ও নির্মাণ, শরৎচন্দ্র ও ভারতীয় সাহিত্য এবং ভাষান্তরে শরৎ-সাহিত্য নিয়ে আলোকপাত করবেন গবেষক শিক্ষক লেখক সারস্বতেরা।
ভ্রমণ-মন
কাদের পায়ের তলায় সর্ষে, এর উত্তরে ফরাসি কি ইউরোপের আর মানুষদের পাশাপাশি বাঙালিও যে গর্ব ও তৃপ্তির হাসিটি হাসবে, সন্দেহ নেই। শরতে শীতে গরমে বর্ষায় ভ্রমণপিপাসু বঙ্গমন উন্মন হয়ে থাকে ফের বেরিয়ে পড়তে। এ শহরের ভ্রমণ-লেখকদের নিজস্ব সংগঠন ‘ট্রাভেল রাইটারস’ ফোরাম’ তাদের নানাবিধ কাজের মধ্যে নিয়ম করে আয়োজন করে বার্ষিক ভ্রমণ বিষয়ক সেমিনারও, অষ্টাদশতম সেমিনারটি আগামী ২৭ মার্চ শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সভাগৃহে। রংগন চক্রবর্তী বলরাম বসু ও তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায় বলবেন সেখানে, আর স্লাইড দেখিয়ে হিমালয়ের পাখিদের সুলুকসন্ধান দেবেন কল্লোল মুখোপাধ্যায়।
পুতুলের দিন
পুতুলনাচ ও পুতুলনাট্যে সবই আছে: অঙ্গভঙ্গিমা, মঞ্চ ও পোশাক-সজ্জা, আলো-ছায়ার খেলা, সংলাপ, অভিনয়, কারিগরি দক্ষতা। দেশে দেশে, নানা ভাষা-সংস্কৃতিতে পুতুলনাচ ও নাট্যের বিচিত্রতা ও প্রাচীনতা তাকে করে তুলেছে শিল্পকলার অনুপম অঙ্গ, ২১ মার্চ দিনটি ইউনেস্কো-সূত্রে স্বীকৃত ‘বিশ্ব পাপেট্রি দিবস’ রূপে। কলকাতার পাপেট্রি-দল ‘ডলস থিয়েটার’ দিনটি উদ্যাপন করে কর্ণধার সুদীপ গুপ্ত ও ওঁর সহযোগীদের নেতৃত্বে, ৭৪বি সেলিমপুর রোডে ওঁদের ঠিকানা পাপেটোরিয়াম-এ। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে নানা অনুষ্ঠান: উদ্বোধন পুতুল-সঙ্গীত ‘ইকির মিকির’-এর নিবেদনে; ছায়াপুতুল ও কথা-বলা পুতুলের প্রদর্শন স্বপ্না সেন ও সম্রাট রায়ের উপস্থাপনায়। অভীক ভট্টাচার্যের পরিচালনায় ‘নট আ স্টোরি টেলার’ পরিবেশন করবে আগাডুম বাঘাডুম।
স্ব-রূপে
সত্তর দশকে পেশাদার যাত্রায় বার্ষিক আয় পাঁচ লক্ষ টাকা, যাত্রা দলের মালিকদের মধ্যে টানাপড়েন চলত ছন্দা চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে, নামের আগে লেখা হত ‘মর্ত্যের ঊর্বশী’! উৎপল দত্তের টিনের তলোয়ার নাটকে তিনিই ময়না। সাত দশকেরও বেশি সময় জুড়ে কাজ করেছেন ঠাকুরদাস মিত্র অহীন্দ্র চৌধুরী পাহাড়ী সান্যাল বিকাশ রায় সরযূবালা মলিনাদেবী উত্তমকুমার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সবার সঙ্গে। থিয়েটারি জনস্মৃতিতে আজও ধরা তাঁর গাওয়া গান, ‘ছেড়ে কলকেতা... হব পগার পার’। এ বার তাঁর জীবনকথা মঞ্চে আনছে ‘উষ্ণিক’-এর নতুন নাটক ইতি ছন্দা, ঈশিতা মুখোপাধ্যায়ের রচনা-নির্দেশনায় প্রথম অভিনয় ২২ মার্চ রবিবার সন্ধে ৬টায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে। বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অভিনয় করবেন নিজ ভূমিকায়!
জরুরি কাজ
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে দীনেন্দ্র স্ট্রিট ধরে দেশবন্ধু পার্ক পেরিয়ে, কাছেই সংস্কৃত সাহিত্য পরিষদ। ভিতরে তিন তলায় লাইব্রেরি। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সংস্কৃত সাহিত্য নতুন করে পড়ার রেওয়াজ হল বিদেশি ভাষার বিরুদ্ধে, সে সময় কয়েকজন নাট্যকর্মী সংস্কৃত নাটকের বই জড়ো করেছিলেন, লাইব্রেরির সেই শুরু। এই নাটক আর দেশ ও দশের ইতিহাস বুকে নিয়ে, টিকে থাকার প্রায় ১৬০ বছর পরে, ২০২৫ থেকে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ‘এনডেঞ্জারড আর্কাইভ প্রোগ্রাম’ এবং ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ় অ্যান্ড রিসার্চ (আইএলএসআর) এই লাইব্রেরির বইপত্র, পরিষদের পত্রিকা ও অন্যান্য নথির ডিজিটাইজ়েশনের কাজ করছে। কত না মণিমুক্তো— শাক্ত ও তান্ত্রিক দর্শন, ন্যায় ও নব্যন্যায়, বৈষ্ণব দর্শনের মননসম্পদ। যুদ্ধলাঞ্ছিত, অধিকারহারা এই সময়ে হারিয়ে যাওয়া, চিরন্তন চিন্তাধারার পুনরুন্মীলন হচ্ছে যেন এখানে।
চতুর্ভুজ
নির্দিষ্ট গোষ্ঠীচেতনা বা ভাবধারা ঘিরে গড়ে ওঠে শিল্পচর্চা। এক-একটি যুগ যেন নিজেই ম্যানিফেস্টো তৈরি করে, যার প্রকাশ ঘটে শিল্পভাষায়। আবার এর ভিতর থেকেই ফুটে ওঠে ব্যক্তিসত্তার স্বতন্ত্র প্রকাশের পথও। এই প্রেক্ষিতেই ‘চতুর্ভুজ’কে বলা যেতে পারে— কোনও দল বা সঙ্ঘ নয়, সমমনস্কতার বিন্যাস। তার চারটি দিক চার জন শিল্পীর ভাবনা ও অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। সুশান্ত কর্মকার, প্রদীপ ঘোষ, কুন্তল দত্ত ও দেবাশীষ ধারা তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিকে এক সঙ্গে উপস্থিত করেছেন; প্রত্যেকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার বহু-তল থেকে সমাজ, ভূগোল, জীবনের পরিবর্তন অনুবাদ করেছেন দৃশ্যকলায়। ‘চতুঃ’ এখানে শুধুই সংখ্যা নয়, চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবতার বহুমাত্রা অনুধাবনের উপায়। আগামী ২২-৩১ মার্চ, ১২টা-৮টা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের নর্থ, ওয়েস্ট ও নিউ সাউথ গ্যালারিতে এই চিত্রপ্রদর্শনী (ছবিতে একটি), কিউরেশন ও নির্মাণ-বিন্যাসে পার্থ দাশগুপ্ত দেবদত্ত গুপ্ত।
বাসন্তী, হে
শারদ দুর্গাপূজা ‘অকালবোধন’ রূপে লোকপ্রিয় হলেও, পৌরাণিক মতে বসন্তে রাজা সুরথের করা বাসন্তী পূজাই ‘আদি’ দুর্গাপূজা। সেই ঐতিহ্য আজও ধরে আছে শহরের প্রতিমা তৈরির আঁতুড়ঘর কুমোরটুলি। দুর্গা-পরিবারের প্রথাগত অবস্থানের তুলনায় এখানে গণেশ ও কার্তিকের স্থান অদলবদল করা হয়: লক্ষ্মীর পাশে কার্তিক (ছবি), সরস্বতীর পাশে গণেশ। শাস্ত্রজ্ঞদের একাংশের মত, কার্তিক ও গণেশের এই অবস্থান প্রাচীন শৈব-পরম্পরারই ইঙ্গিতবহ। কুমোরটুলির বনমালী সরকার স্ট্রিটে পূজা শুরু হয় ষষ্ঠীতে, অষ্টমীতে বিশেষ অন্নপূর্ণা পূজার আয়োজন, নবমীর দিন প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা। এ বছরও সেই দিনক্ষণ সমাগত, আগামী ২৪ মার্চ শুরু। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মৃৎশিল্পীদের উদ্যোগে যার সূচনা, আজ তা সমগ্র কুমোরটুলির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সমারোহ
ছাত্রছাত্রীদের একক উদ্যোগে থিয়েটার ও সিনেমার বৃহত্তম বার্ষিক উৎসব ‘ছায়ানট’, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেটসু-র উদ্যোগে আগামী ২৩-২৭ মার্চ। ঋত্বিক ঘটকের ছোট ছবি ফিয়ার, সত্যজিতের নায়ক-এর রেস্টোর্ড ভার্সন; মঞ্চে সিডনি লুমেটের টুয়েলভ অ্যাংরি মেন-এর আধারে নান্দীকার-প্রযোজনা এক থেকে বারো। প্রদর্শনী, আলোচনার পাশাপাশি পথনাটক, দেওয়াল ও পথ-চিত্র, কুইজ়, চিত্রনাট্য লেখার প্রতিযোগিতা; পড়ুয়াদের তৈরি ছোট ছবি প্রদর্শনের পাশে ক্যামেরার খুঁটিনাটি এবং সিনেম্যাটোগ্রাফির কর্মশালা। রয়েছে দেবজ্যোতি মিশ্র, কলকাতা রয়্যাল অনসম্বল কোয়ার্টেট-এর সঙ্গীত। কানু বহেলের আগরা, দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিস-সহ এই সময়ের পরিচালকদের কাজ, মাস্টারক্লাস, কী নেই! নো আদার চয়েস, ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন গাজ়া বড় পর্দায় দেখার সুযোগ।