প্রশান্ত ঘোষ, ভাঙড়
পরিযায়ী পাখিদের (Migrant Bird) মতো ভোট এলেই ভাঙড়ে ভিড় করে ওরা। কয়েক মাসের জন্য তারা ভাঙড়ের (Bhangar) বিভিন্ন গোপন ডেরায় আশ্রয় নেয়। কেউ আসে হাড়োয়া থেকে, কেউ আবার আসে দেগঙ্গা, আমডাঙা, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি থেকে। এরা সবাই বোমা বাঁধায় পারদর্শী। সারা বছর টুকটাক কাজ পেলেও ভোটের সময় তাদের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক আসে। ফলে এই সময়টায় তাদের নিয়ে টানাটানি চলে। সুযোগবুঝে তারাও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দাবি করে বসে। তাতে একটু বাড়তি খরচ হয় ঠিকই, কিন্তু ভোটের স্বার্থে সেই খরচ বহন করতে কখনও পিছপা হয় না তাদের আশ্রয়দাতারা।
ভোটে অশান্তি রুখতে নির্বাচন কমিশন (Election Commission) এ বার অভূতপূর্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এক মাস আগে থেকেই রাজ্যে শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চলছে পুলিশের নাকা চেকিং। খোদ নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকুমার আশ্বাস দিয়েছেন, এ বারের বিধানসভা ভোটকে হিংসামুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর তিনি। কিন্তু তাতে কি ভোটে বোমা-গুলির রমরমা কমবে ভাঙড়ে— সংশয়ে সেখানকার বাসিন্দারা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দেগঙ্গা থেকে এক কারিগরকে বোমা তৈরির জন্য গতবার আনা হয়েছিল ভাঙড়ে। এ বারও তাঁর ডাক পড়েছে। সূত্রের দাবি, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় বোমা বাঁধার কারিগররা পারিশ্রমিকও কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে এক রাতের জন্য এই কারিগরদের দিতে হতো ৫–৭ হাজার টাকা। এ বার সেটা বেড়ে হয়েছে মাথাপিছু ৮-১০ হাজার টাকা। তার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া ও মদের টাকাও জোগাতে হয়।
ভোটের মুখে ভাঙড় থেকে একের পর এক তাজা বোমা উদ্ধারের ঘটনায় চিন্তা বেড়েছে পুলিশকর্তাদের। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় টহলদারি বাড়ানো হয়েছে। ভাঙড়ের আশপাশের সব জায়গায় নাকা চেকিংয়ের উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে থেকে আতঙ্ক দূর করতে এলাকায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী টহলদারিও চালাচ্ছে। ভাঙড়ে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এমনকী এই এলাকা কলকাতা পুলিশের আওতায় আসার পরেও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিরাট উন্নতি হয়েছে, এমনটা নয়। গত বুধবার গভীর রাতে ভাঙড়ের বিজয়গঞ্জ বাজার থানার দক্ষিণ বামুনিয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। কাকতালীয় ভাবে পরের দিন সকালে হাড়োয়া থেকে একটি ঝলসানো দেহ উদ্ধার হয়। মনে করা হচ্ছে, এটি সম্ভবত ভাঙড়ের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত ব্যক্তির দেহ।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি পোলেরহাট থানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লার গাড়ির সামনে বোমা ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বানিয়াড়া গ্রাম থেকে ২৮টি তাজা বোমা ও একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার হয়। তার ঠিক এক সপ্তাহ পরে কৃষ্ণমাটি গ্রাম থেকে ২৬টি তাজা বোমা পায় পুলিশ। পরের দিন কৃষ্ণমাটি প্রাইমারি স্কুলের কাছে দু'টি দুধের ট্যাঙ্ক থেকে প্রায় ৫০ কেজি বারুদ–সহ বোমা তৈরির মশলা উদ্ধার হয়। এ সব দেখে আতঙ্কের প্রহর গুণছেন ভাঙড়ের বাসিন্দারা। প্রশ্ন উঠছে, ভোটের আগে নিরাপত্তার মধ্যে কী ভাবে ভাঙড়ে গোলাবারুদ ও বেআইনি অস্ত্র ঢুকছে? পুলিশের এক কর্তার ব্যাখ্যা, বোমা তৈরির জন্য েয সব মালমশলা লাগে, তার জোগান সব বাইরে থেকে আসে। তার জন্য আলাদা এজেন্ট আছে। তারা নিজেদের দায়িত্বে ভাঙড়ে পৌঁছে দিয়ে যায়। ইট, বালির লরিতে করেও গোপনে বোমার মশলা চলে আসছে। কোনও সময় সেটা ধরা পড়ে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ সেটা জানতেই পারে না।
আরাবুল ইসলামের দাবি, বৃহস্পতিবার সকালে মসিউর কাজি নামে যে ব্যক্তির দেহ উদ্ধার হয়েছে হাড়োয়ায়, তিনি ভাঙড়ে বোমা বানাতে এসেছিলেন। বোমা বানানোর সময়ে বিস্ফোরণ ঘটে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর অভিযোগ, 'ভোটের আগে তৃণমূল বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে আনছে বোমা বানানোর জন্য।' ভাঙড়ের তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লার পাল্টা দাবি, 'বোমা বাঁধা, বোমা মারা— সবই আইএসএফের কাজ। বানিয়াড়া ও কৃষ্ণমাটির ঘটনায় আইএসএফ কর্মীর যোগ পাওয়া গিয়েছে।'
কতগুলি বোমা তৈরি করবে, তার উপরে মজুরি নির্ভর করে। সাধারণত ৮-১০ হাজার টাকা এক রাতের জন্য লাগে। বোমার সাইজ় অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত