• ‘বাঁচাও, বাঁচাও!’ ঝাঁকুনি দিয়ে লিফট নামতেই সব শেষ, কী ভাবে ঘটে RG Kar-এর ভয়ঙ্কর ঘটনা?
    এই সময় | ২১ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: 'বাঁচাও বাঁচাও! কেউ আমাদের বাঁচাও!'— অনেক চিৎকারেও শেষরক্ষা হলো না। কেউ এগিয়ে আসেননি লিফটের ভিতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে। ফলে ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে লিফট–দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ গেল বাবার। শুক্রবার ভোরে ঘটনাটি ঘটে আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার (RG Kar Hospital Trauma Care) বিল্ডিয়ের ২ নম্বর লিফটে। মৃতের নাম অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় (৪০), বাড়ি দমদমের (DUMDUM) জ পুর রোডে।

    প্রাথমিক সন্দেহ, লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং তারই পাশাপাশি লিফটম্যান ও নিরাপত্তাকর্মীদের কর্তব্যে গাফিলতির জেরে জন্মদিনের পরের ভোরেই এ ভাবে অকালমৃৃত্যু হলো অরূপের। মৃতের পরিবারের তরফে এ নিয়ে গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের কাছে। বিএনএস ১০৫/৩(৫) ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু হয়েছে। এই ঘটনায় পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস এবং মানসকুমার গুহ—তিন জনই লিফটম্যান। এ ছাড়াও গ্রেপ্তার করা হয়েছে নিরাপত্তারক্ষী আসরাফল রহমান ও শুভদীপ দাসকে। এ দিন রাতেই টালা থানার থেকে তদন্তভার হাতে নিয়েছে কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশ।

    পারিবারিক সূত্রের খবর, দক্ষিণ দমদম পুরসভার (South Dumdum Municipality) কর্মী অরূপের জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা এসেছিলেন। অরূপের চারবছরের ছেলে তার পিসতুতো দাদার সঙ্গে খেলতে খেলতে খাট থেকে পড়ে যায়। তাতেই হাত ভাঙে। অত রাতে অন্যত্র ডাক্তার মিলবে কি না, সেই সংশয় থেকে আরজি করে নিশ্চিত চিকিৎসার আশাতেই ছেলেকে নিয়ে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ সস্ত্রীক অরূপ আসেন আরজি করে। ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে ইমার্জেন্সি ডিউটিরত অর্থোপেডিক্সের চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, অপারেশন করতে হবে। সে কথা শুনে, অরূপের বাবা, পিসতুতো বোন, ভগ্নিপতি–সহ আরও ৮–১০ জন আত্মীয় রাতেই আরজি করে চলে আসেন।

    ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের দোতলায় অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। ভোর পৌনে চারটে নাগাদ অস্ত্রোপচারের আগে ছেলেকে নিয়ে শৌচালয় যাওয়ার উদ্দেশ্যেই অরূপ ও তাঁর স্ত্রী ওঠেন ওই লিফটে। গন্তব্য ছিল চারতলা। কিন্তু সেখানে না গিয়ে লিফট একাধিক বার কোনও কম্যান্ড ছাড়াই উপর–নীচ করে। কখনও সাততলায় তো কখনও বেসমেন্টে! অরূপের স্ত্রী মুক্তা জানান, তখনই তাঁদের ছেলে বলে ওঠে, 'লিফট–টা খারাপ মনে হয়!' ভয় পেয়ে যান তিন জনে। কারণ, লিফট মাঝে মাঝে একাধিক ফ্লোরে থামলেও, দরজা খোলেনি। একসময়ে বেসমেন্টে নেমেও দাঁড়িয়ে যায়। দরজাও খোলে। কিন্তু বেসমেন্ট রাতে পুরোপুরি বন্ধ থাকায় লিফট থেকে বাইরে বেরোনোর মুখে গ্রিলের গেট ছিল তালাবন্ধ। ফলে সেখান দিয়ে বেরোতে পারেননি কেউ–ই। এই ওঠানামায় কেটে যায় ঘণ্টাখানেক। এর মধ্যেই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়ে ফের উঠতে শুরু করে। কিন্তু পুরোপুরি তা দোতলায় পৌঁছয়নি।

    একতলার মেঝের স্তর বেশ কিছুটা পেরিয়ে মাঝামাঝি জায়গায় লিফট থেমে গিয়ে দরজা খুলে যায়। কোনও ক্রমে ছেলে ও স্ত্রীকে লিফটের ভিতর থেকে অনেকটা উঁচু জায়গায় বাইরে লাফ দিয়ে বেরোতে সাহায্য করেন অরূপ। তাতে মা–ছেলে বেরিয়ে এলেও সামান্য আহত হন। বিপত্তি হয় অরূপ বেরোতে যাওয়ার সময়ে। তিনি যখন বেরোতে যাচ্ছেন, সে সময়েই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অরূপের শরীরের ঊর্ধ্বাংশ তখন লিফটের বাইরে, বাকিটা ভিতরে। তখনই ঝাঁকুনি দিয়ে আচমকা লিফট ফের বেসমেন্টের দিকে নামতে থাকে। তার ফলে চলন্ত লিফট ও ফ্লোরের মাঝে আটকে যাওয়া অরূপের শরীর মারাত্মক অভিঘাতে দুমড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে কিছু ক্ষণ পরে উদ্ধার করে ট্রমা কেয়ারের ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।

    এক চিকিৎসকের কথায়, 'যখন ওঁকে ওয়ার্ডে আনা হয়, তখন নাক–মুখ দিয়ে অনর্গল রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ফেটে গেলে এমন হয়। ততক্ষণে শরীরে আর প্রাণ ছিল না।' পরে দেহের ময়নাতদন্তেও যে তথ্য উঠে আসে, তা শিউরে ওঠার মতো। দেখা যায়, ওই চিকিৎসকের আশঙ্কাই সত্যি। ময়নাতদন্তে দেখা গিয়েছে, অরূপের পাঁজরের প্রায় সব হাড় ভাঙা, হাত ও পায়ের হাড়ও ভাঙা এবং হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, প্লীহা, অগ্ন্যাশয়, লিভার ইত্যাদির মতো পেট ও বক্ষগহ্বরের অভ্যন্তরীন অঙ্গগুলি ফেটে (রাপচার) গিয়েছে। অর্থাৎ, অভিঘাতের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মৃত্যু হয়।

    মৃতের ভগ্নিপতি শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, গত রাতেই অরূপকে তিনি ছেলেকে নিয়ে কোনও বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু ছোট্ট ছেলে কষ্ট পাবে, এই ভেবে অরূপ জানান, হাসপাতালে শিগগিরই অপারেশন করা হবে বলা হয়েছে। তাই অন্যত্র দৌড়োদৌড়ি করে ছেলের কষ্ট বাড়ানোর মানে হয় না। শিবাশিস বলেন, 'লিফটে ওঠার বেশ কিছুক্ষণ পরে ওদের 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার শুনি। উদ্বিগ্ন হয়ে ছোটাছুটি শুরু করি। আমার স্ত্রী সিআইএসএফ কর্মীর কার্যত পায়ে ধরে অনুরোধ করেন সাহায্যের জন্য। নীল পোশাকের বেসরকারি সুরক্ষাকর্মীদেরও অনুরোধ করা হয়। কেউ সাহায্য করেননি।' অরূপের ভায়রাভাই কৃষ্ণেন্দু সিনহা জানান, বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়ির দরজা বন্ধ ছিল। যেখানে লিফট খোলে সেখানেও গ্রিলের দরজা তালাবন্ধ ছিল।

    শিবাশিস আরও বলেন, 'ঘণ্টাখানেকের বেশি ওরা লিফটে আটকে ছিল। লিফট দোতলায় থামলে শেষে হাতুড়ি জোগাড় করে বন্ধ দরজা খোলার চেষ্টা করি। লাভ হয়নি। কিছুক্ষণ পরে দেখি এক প্রাইভেট নিরাপত্তারক্ষী অরূপের ছেলেকে নিয়ে আসছেন। ততক্ষণে ছেলে ও স্ত্রীকে বাইরে ঠেলে দিয়েছিলেন অরূপ। কোনও মতে কয়েক জন মিলে লিফট খুলে অরূপের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করি। তখনও উনি বাঁচাতে চেয়েছিলেন। নিমেষে মধ্যে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।' তিনি জানান, সকালেই শিশুটির হাতে সফল অস্ত্রোপচার হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন মুক্তাও। যদিও পরে তাঁদের দু'জনকেই একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

    দুর্ঘটনার পরেই ঘটনাস্থলে যান ডিসি নর্থ দীনেশ কুমার, স্থানীয় কাশীপুর–বেলগাছিয়ার বিজেপি প্রার্থী রীতেশ তিওয়ারি এবং তৃণমূল প্রার্থী তথা এলাকার বিদায়ী বিধায়ক অতীন ঘোষ। অরূপের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'আমার ছেলেকে খুন করেছে। পুলিশকে অনুরোধ করি, দমকলকে ডাকার জন্য যাতে দরজা খোলে। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি।' তাঁর আক্ষেপ, বেসমেন্টের গ্রিল ভাঙলে তাঁর ছেলে বেঁচে যেত। অথচ সকলেই অজুহাত দিয়েছে, গ্রিলের গেটের চাবি পূর্ত বিভাগের কাছে রয়েছে বলে। অতীন আরজি করের রোগীকল্যাণ সমিতির সদস্যও। তিনি বলেন, 'প্রশাসনিক গাফিলতি রয়েছে। লিফটে টেকনিক্যাল সমস্যা ছিল, যে কারণে বার বার ওঠানামা করে। ডিউটি যাঁরা করছিলেন, তাঁরা কোথায় ছিলেন? রোগীকল্যাণ সমিতির বৈঠক হয় না।' আরজি করের উপাধ্যক্ষ তথা মেডিক্যাল সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় বলেন, 'অটোম্যাটিক লিফটটি ফ্লোর এলে দরজা খোলে। তা হলে মাঝ–প্যানেলে দরজা খুললো কী করে? পূর্ত বিভাগের ইলেকট্রিক্যাল শাখা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'

  • Link to this news (এই সময়)