• ‘ফোঁটা ফোঁটা রক্ত এসে পড়ছিল গায়ে’, RG Kar-এর ‘মৃত্যুফাঁদ’ লিফটে স্বামীর শেষ মুহূর্তের বর্ণনায় শিউরে উঠলেন স্ত্রী!
    এই সময় | ২১ মার্চ ২০২৬
  • ফোঁটা ফোঁটা রক্ত এসে পড়ছিল তাঁর গায়ে। স্বামীর দেহটা আটকে থাকা অবস্থাতেই ঘষটে ঘষটে উঠে যাচ্ছিল লিফটটা। আতঙ্কে গলা ফাটিয়ে অসহায়ের মতো চিৎকার করেও সুরাহা পাননি। যতক্ষণে সাহায্য এল ততক্ষণে সব শেষ। আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারের লিফটের ঘটনার পরে থেকেই ট্রমায় অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী মুক্তা। ছেলেকে সুস্থ করার জন্য হাসপাতালে গিয়ে এ রকম মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবেননি নিহত অরূপের স্ত্রী।

    আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার (RG Kar Hospital Trauma Care) বিল্ডিয়ের ২ নম্বর লিফট আস্ত মৃত্যুফাঁদ, এ ভাবেই বর্ণনা করছেন অন্যান্য রোগীর আত্মীয়রা। তাতেই শুক্রবার ভোরে উঠেছিলেন দমদম পুরসভার কর্মী অরূপ, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে। ভয়াবহ সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়েও শিউরে উঠছেন মৃত যুবকের স্ত্রী। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার অরূপের (Arup Banerjee) জন্মদিন ছিল। ওই দিন রাতেই বাড়িতে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলে তাঁদের চার বছরের ছেলে। অত রাতে অন্যত্র ডাক্তার মিলবে কি না, সেই সংশয় থেকে আরজি করে নিশ্চিত চিকিৎসার আশাতেই ছেলেকে নিয়ে আরজি করে এসেছিলেন বছর ৪০-এর ওই যুবক। চিকিৎসকেরা জানান, অপারেশন করতে হবে। তাঁর আরও অভিযোগ, অপারেশনের আগে বাথরুমে যেতে চায় ছেলে, কিন্তু তাদের অপারেশন থিয়েটারের সামনে শৌচালয় ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। সে কারণেই বাধ্য হয়ে লিফটে উঠে পাঁচতলায় যাচ্ছিলেন তাঁরা। চার বছরের ছেলের অপারেশনের আগে শৌচালয় ব্যবহার করতে না দেওয়া কেন? সেই নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

    মুক্তার কথায়,‘লিফটে উঠে নির্দিষ্ট ফ্লোরের বাটন টিপতে প্রথমে উপরে ওঠে কিন্তু দরজা খোলে না। লিফট একাধিক বার কোনও কমান্ড ছাড়াই উপর–নীচ করে। কখনও সাত তলায়, তো কখনও বেসমেন্টে নেমে যায়। ভয়ে পেয়ে যাই আমরা।’ এর পরে বেসমেন্টে নেমেও দাঁড়িয়ে যায়। দরজাও খোলে। কিন্তু বেসমেন্ট রাতে পুরোপুরি বন্ধ থাকায় লিফট থেকে বাইরে বেরোনোর মুখে গ্রিলের গেট ছিল তালাবন্ধ, বলে জানান নিহত যুবকের স্ত্রী। এর পরের ঘটনাই ছিল মারাত্মক।

    চোখের সামনে স্বামীকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন মুক্তা। তিনি বলেন, ‘বেসমেন্টে পৌঁছনোর পরে দরজা এক বার খুলেছিল। কোনও মতে আমাকে আর ছেলেকে বাইরে বার করে দেয় ও। লিফটের বেসমেন্টে সামনের দিকে অল্প একটু দাঁড়াবার খাঁজ আছে। ওখানেই দাঁড় করাই ছেলেকে। ওখানে আর দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। ও (অরূপ) অর্ধেকটা লিফটের ভিতর ছিল, অর্ধেকটা বাইরে। হঠাৎই লিফ্‌ট উপরে উঠতে শুরু করে। ধাক্কায় লিফটের গর্তে পড়ে যাই আমি আর ছেলে। পাগলের মতো সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলাম। কেউ আসেনি।’

    এর পরের ঘটনা মনে করে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত যুবকের স্ত্রী। বলেন, ‘অরূপের শরীরের ঊর্ধ্বাংশ তখন লিফটের বাইরে, দেহের বাকিটা ভিতরে। সেই অবস্থায় লিফট ঘষটাতে ঘষটাতে উপরে উঠে যায়। গর্ত থেকে আমি কোনও রকমে পাশের জায়গাটুকুতে ছেলেকে তুলতে পেরেছিলাম। আপ্রাণ চিৎকার করে যাচ্ছিলাম। যদি কেউ আসে। হঠাৎ দেখি ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে আমার গায়ে।’ সেই রক্ত ছিল অরূপেরই। কয়েক সেকেন্ড পরে তাঁর রক্তাক্ত দেহটাও ছিটকে এসে পড়ে স্ত্রীর কোলে। ভয়াবহ এই ঘটনার ট্রমায় এখনও চোখের জল সামলাতে পারছেন তিনি। বার বার বলছেন,‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সব ঘটে গেল...।’

    দুর্ঘটনার বহুক্ষণ পরে রক্তাক্ত অরূপ, তাঁর আহত ছেলে এবং স্ত্রীকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, অরূপকে যখন ওয়ার্ডে আনা হয়, তখন নাক–মুখ দিয়ে অনর্গল রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ততক্ষণে শরীরে আর প্রাণ ছিল না। দেহের ময়নাতদন্তেও সামনে আসে শিউরে ওঠা তথ্য। অরূপের পাঁজরের প্রায় সব হাড়ই ভেঙে গিয়েছিল। বাঁ হাত ও ডান পায়ের হাড়ও ভাঙা এবং হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, প্লীহা, অগ্ন্যাশয়, লিভার ইত্যাদির মতো পেট ও বক্ষগহ্বরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলি ফেটে (রাপচার) গিয়েছে। অর্থাৎ, অভিঘাতের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মৃত্যু হয়।

  • Link to this news (এই সময়)