এই সময়: স্ত্রীকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তকে বেকসুর খালাস করল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। ২০১৫–য় দায়রা আদালতের দেওয়া সাজা খারিজ করতে গিয়ে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং বিচারপতি রাই চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দেওয়া কোনও মৃত্যুকালীন জবানবন্দি একমাত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে সাজা দেওয়া যায় না। দায়রা আদালত দোষী সাব্যস্ত করে মৃতার স্বামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, পুলিশের পেশ করা তথ্যপ্রমাণে অভিযুক্তের অপরাধ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়নি।
মামলায় অভিযোগ ছিল, পণের দাবিতে নিয়মিত নির্যাতন চলত। সে রকমই এক নির্যাতন–পর্বে অভিযুক্ত স্বামী কেরোসিন ঢেলে স্ত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। দায়রা কোর্টে বিচার চলাকালীন মামলাটি বড় ধাক্কা খায়। মৃতার বাবা, ভাই পর্যন্ত বিরূপ সাক্ষী হন। তাঁরা জানান, রান্না করার সময়ে দুর্ঘটনাবশত আগুনে পুড়ে জখম হয়েছিলেন তরুণী। কয়েক জন প্রতিবেশীও পুলিশের বক্তব্য সমর্থন করেননি। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, পরিবারের সদস্য ও স্বাধীন সাক্ষীদের একসঙ্গে উল্টো বক্তব্য পেশ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েই গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণও পুলিশের বক্তব্যকে নিশ্চিত ভাবে সমর্থন করেনি। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানাতে পারেননি, দহনের ক্ষত হত্যার ফল, নাকি আত্মহত্যাজনিত। হাসপাতালের নথিতেও অসঙ্গতি ছিল। একটি নথিতে উল্লেখ ছিল, দহন–ক্ষত নিজে থেকেও করা হয়ে থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দায়রা আদালত মূলত হাসপাতালে রেকর্ড করা মৃত্যুকালীন জবানবন্দির উপরে নির্ভর করেই সাজা দিয়েছিল, যেখানে স্বামীর বিরুদ্ধে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে হাইকোর্ট ওই জবানবন্দিকে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য বলে মনে করেছে। ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ঘটনার পরে তরুণী প্রায় দশ দিন জীবিত ছিলেন। তবুও কোনও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করায়নি পুলিশ। যে চিকিৎসক এটি নথিবদ্ধ করেছিলেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাগত তথ্য উল্লেখ করেননি। এ ছাড়া যে নার্স ওই জবানবন্দির সাক্ষী ছিলেন তাঁকে তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি।
ওই তরুণী সে সময়ে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিবৃতি দেওয়ার উপযুক্ত অবস্থায় ছিলেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। উপরন্তু চিকিৎসক নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তরুণীর উচ্চারণ সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি কনফিডেন্ট ছিলেন না। পুলিশের তদন্ত নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারী অফিসার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের গোপন জবানবন্দি রেকর্ড করানোরও ব্যবস্থা করেননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ডিভিশন বেঞ্চের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘মৃত্যুকালীন জবানবন্দি অনেক ক্ষেত্রে সাজা দেওয়ার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য এবং সন্দেহমুক্ত হতে হবে। বর্তমান মামলায় জবানবন্দি ঘিরে এত অসঙ্গতি ও সন্দেহ রয়েছে যে তা কোনও সমর্থনমূলক প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।