আর জি কর ফিরিয়ে আনল ভয়াবহতার স্মৃতি, ম্লান ইদের আনন্দ
আনন্দবাজার | ২২ মার্চ ২০২৬
বছর তিনেক আগে এক লিফ্ট দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল একটি পরিবারের সকলের জীবন। সেই ঘটনায় স্বামীকে হারিয়েছিলেন স্ত্রী। বাবাকে হারিয়েছিলেন ছেলে। মা-ছেলের ছন্দে ফেরার লড়াই এখনও চলছে। এরই মধ্যে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফ্ট দুর্ঘটনায় এক জনের মৃত্যু যেন তাঁদের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে ফের দগদগে করে দিয়েছে। তাই ইদের উৎসবও একবালপুরের একচিলতে ঘরের পরিবেশ বদলাতে পারেনি। শনিবার গোটা পাড়া ইদ উদ্যাপনে মাতলেও মা-ছেলে ঘরেই নিজেদের বন্দি করে রাখেন দিনভর।
২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতোই লিফ্ট দুর্ঘটনা ঘটেছিল পার্ক স্ট্রিটের একটি বহুতল অফিসে। মৃত্যু হয়েছিল লিফ্টকর্মী আব্দুল রহিম খানের। সে দিন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলার সময়ে আচমকাই প্রবল গতিতে নীচে নেমে আসে বহুতলের সেই লিফ্ট। ওই সময়ে নীচের তলায় দাঁড়ানো বছর পঞ্চাশের রহিম লিফ্টের সুড়ঙ্গে মাথা বাড়িয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেখছিলেন। লিফ্ট সোজা নেমে এসে পিষে দেয় তাঁকে। সুড়ঙ্গের নীচে তাঁকে নিয়ে নেমে যায় লিফ্ট। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় রহিমের।
একবালপুরের ছোট্ট ঘরে ছেলে আব্দুল করিম খান এবং স্ত্রী শামিমা বেগমকে নিয়ে থাকতেন রহিম। ফোনে বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে পার্ক স্ট্রিটের অফিসে মাকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ছেলে। সে দিনের সেই ঘটনার স্মৃতিকে দগদগে করে তুলেছে আর জি করে লিফ্ট দুর্ঘটনায় এক জনের মৃত্যুর ঘটনা। করিম বললেন, ‘‘শুক্রবার সকালে আমরা কেউই আর জি করের ঘটনার কথা জানতে পারিনি। বেলার দিকে খবর পাই। ইচ্ছে করেই মাকে তখন বলিনি। বিকেলের দিকে মোবাইল দেখে মা নিজেই জানতে পারেন। তার পর থেকেই কেমন যেন চুপ করে গিয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে মা ইদের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ওই খবর শোনার পর থেকে ইদের আনন্দ উধাও। সারা দিন শুধু শুয়ে থেকেছেন।’’
এ দিন সকালে ইদের নমাজ পড়তে এক বারই বেরিয়েছিলেন করিম। তার পরে ঘরের বাইরে পা রাখেননি। একই ভাবে নিজেকে ঘরবন্দি রেখেছিলেন শামিমাও। করিম বললেন, ‘‘আর জি করের ঘটনার কথা শোনার পর থেকে মা বার বার বাবার ছবির সামনে যাচ্ছিলেন। ইদের আনন্দ শুক্রবার বিকেল থেকেই ম্লান হয়ে যায়। আজ সকালেও বাড়ির পরিবেশ ছিল একই রকম। নামমাত্র রান্না করেই মা কাজ সেরেছেন এ বার।’’
পার্ক স্ট্রিটের বহুতলে লিফ্ট দুর্ঘটনায় মৃত রহিমের পরিবারে সদস্য বলতে আছেন শুধু তাঁর ছেলে এবং স্ত্রী। ছেলেই মায়ের দেখাশোনা করেন। রহিমের মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারকে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। ছেলেকে দেওয়া হয়েছিল লিফ্টকর্মীর চাকরির প্রস্তাব। যদিও আতঙ্কে বাবার ওই চাকরি নেননি ছেলে। একটি ঠিকাদারি সংস্থার হয়ে আপাতত এসি সারানোর কাজ করেন তিনি। এ দিন করিম বললেন, ‘‘বাবার যে ভাবে মৃত্যু হয়েছিল, তার পরে আর কোন সাহসে ওই একই চাকরি করব? বাবার দেহ রক্তে ভেসে যেতে দেখেছিলাম। সে দিনের কথা ভাবলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।’’