সরকারি হাসপাতালে লিফ্টকর্মী নামেই, তাঁর কাজেও নেই নজরদারি
আনন্দবাজার | ২২ মার্চ ২০২৬
যতগুলি লিফ্টই থাক, একটি বিল্ডিংয়ের জন্য লিফ্টকর্মী বরাদ্দ এক। তাঁরা আদৌ নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, তা দেখার জন্য নেই কোনও ব্যবস্থা। তাই কে আছেন, আর কে বাড়ি চলে গিয়েছেন বা অন্যত্র রয়েছেন, তা-ও অজানাই থাকে। শহরের প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এ ভাবেই চলছে লিফ্ট-সুরক্ষায় নজরদারি। তাতে বিস্তর ফাঁক থাকলেও চিকিৎসক, রোগী এবং পরিজন, সকলেরই ওঠানামায় ভরসা অসুরক্ষিত লিফ্ট।
আর জি কর হাসপাতালের লিফ্টে আটকে থেঁতলে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনার পরে শহরের প্রতিটি হাসপাতালের লিফ্ট-সুরক্ষা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। যদিও লিফ্টের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় কার, তা নিয়েও টানাপড়েন। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, ‘‘লিফ্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পূর্ত দফতরের।’’ শহরের প্রায় প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকেই অভিযোগ উঠছে, অধিকাংশ সময়েই সর্বত্র লিফ্টকর্মী থাকেন না। বরং গভীর রাতে লিফ্ট বন্ধ করে কর্মীদের আড্ডা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শহরের একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘সর্বত্রই ঠিকাকর্মীরা লিফ্ট পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। তাই তাঁদের দায়ও কম, উপযুক্ত প্রশিক্ষণও নেই।’’
সূত্রের খবর, প্রতিটি হাসপাতালের সমস্ত লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পূর্ত দফতরকে টাকা বরাদ্দ করে স্বাস্থ্য দফতর। ওই টাকায় ধরা থাকে লিফ্টকর্মীর বেতনও। আর সেই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দরপত্রডেকে বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়। জানা যাচ্ছে, হাসপাতালের প্রতিটি বিল্ডিংয়ে যতগুলি লিফ্টই থাকনা কেন, তার জন্য এক জনই কর্মী থাকেন। ধরা যাক, কোনও হাসপাতালের একটিবিল্ডিংয়ের ভিতরে দু’টি বা তিনটি লিফ্ট রয়েছে। সেগুলির জন্য বসে থাকেন এক জনই। আধুনিক লিফ্টের ক্ষেত্রে কর্মীর কাছে রাখা থাকে ‘অ্যালেন কি’। কোথাও লিফ্ট আটকে গেলে বাইরে থেকে লিফ্টের ঘরের দরজা খুলতে ওই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে, বেসরকারি হাসপাতালের মতো সরকারি ক্ষেত্রে ভিতরে কর্মী থাকেন না।
সূত্রের খবর, শহরের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজেই কোল্যাপসিবল গেটের পুরনো লিফ্ট বদলে আধুনিক লিফ্ট (সেন্সরের মাধ্যমে ওঠানামা করে) বসানো হচ্ছে। কিন্তু সেই সমস্ত লিফ্টে বড় যান্ত্রিক ত্রুটি হলে কী করণীয়, সেই ধারণা স্পষ্ট নয় কর্মীদের। বড় গোলযোগ হলে সংশ্লিষ্ট লিফ্ট সংস্থাকে খবর দিতে হয়। শহরের এক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কথায়, ‘‘আধুনিক লিফ্টের প্রযুক্তি সম্পর্কে কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য পূর্ত বিভাগকে অনেক বারই বলা হয়েছে।’’
লিফ্টের কর্মীদের উপরে নজরদারি চালানোর দায় কার? প্রতি হাসপাতালেই পূর্ত দফতরের অফিস রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে ঠিকাকর্মীদের উপরে কোনও নজরদারি চালানো হয় না বলে অভিযোগ। সেই সুযোগে প্রতিটি হাসপাতালে যত সংখ্যক লিফ্ট-কর্মী রয়েছেন, তার অন্তত অর্ধেক সকালে কাজে আসার পরে ব্যস্ত থাকেন পরিচিতদের চিকিৎসক দেখাতে বা ভর্তি করাতে। আর রাতে একেবারেই নজরদারি না থাকায় লিফ্টের সামনে কেউ থাকেন না বলেই অভিযোগ কলকাতা মেডিক্যাল থেকে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-সহ সর্বত্রই।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩৮টি লিফ্ট রয়েছে। তার মধ্যে ২২-২৩টি এখনও কোল্যাপসিবল গেট দেওয়া পুরনো। বছর দুয়েক আগে গ্রিন বিল্ডিংয়ের দোতলা থেকে ছিঁড়ে পড়েছিল লিফ্ট। বহির্বিভাগে মাঝপথে আটকে গিয়েছিল পুরনো দিনের লিফ্ট। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রের খবর, পুরনো দিনের লিফ্টের বেসমেন্ট বর্ষায় জলে ডুবে যায়। তাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বার বার বলেও সেই সমস্যার সমাধান আজও হয়নি।
এন আর এসে ১৫টি বিল্ডিং মিলিয়ে লিফ্ট রয়েছে ৩৯টি। তার মধ্যে বক্ষরোগ, স্ত্রীরোগ বিভাগ ও বয়েজ় হস্টেল মিলিয়ে চারটি লিফ্ট অকেজো। সূত্রের খবর, জরুরি বিভাগ বিল্ডিংয়ে পুরনো দিনের লিফ্টে কোনও ভাবে ভার বহন ক্ষমতার থেকে বেশি লোক উঠলেই বিকল হয়ে যায় সেটি। তখন পূর্ত বিভাগ থেকে লোক ডাকতে হয়।
এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ারের ভিতরে দেখা গেল, দুই প্রান্তে থাকা দু’টি করে লিফ্টের সামনে এক জন করে সবুজ জামা পরা কর্মী দাঁড়িয়ে। লোক ওঠার সময়ে কার্ড পরীক্ষা করা এবং দরজা খুলে দেওয়াই তাঁদের দায়িত্ব। এসএসকেএম এবং অ্যানেক্সের আরও ছ’টি হাসপাতাল মিলিয়ে লিফ্ট রয়েছে ৮১টি। তার মধ্যে পুরনো ১৩টি। এসএসকেএমের স্ত্রীরোগ বিভাগে একটি মাত্র লিফ্টে মাঝেমধ্যেই দেখা দেয় সমস্যা।
আবার, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৫টি বিল্ডিং মিলিয়ে ১৫টি লিফ্ট। তার মধ্যে শল্য বিভাগের একটি পুরনো। এক রোগীর পরিজনের কথায়, ‘‘অমুক তলার সুইচ টিপে চলে যান বলা ছাড়া কোনও কাজ করতে তো দেখি না।’’
লিফ্ট নিয়ে পূর্ত দফতরের বিরুদ্ধেই কার্যত উঠেছে অভিযোগের আঙুল। কিন্তু এ নিয়ে পূর্তমন্ত্রী পুলক রায়কে ফোন ও মেসেজ করা হলেও উত্তর মেলেনি।