• RG KAR: বিতর্কে রক্ষীরা, গান শুনতেই ব্যস্ত! আর্তি শুনবে কে?
    এই সময় | ২২ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: লিফটের ভিতরে চার বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে তখন মরণবাঁচন লড়াই করছেন বাবা-মা। ঘণ্টাখানেক ধরে আর্তনাদ করছেন বাঁচার চেষ্টায়। সে সব অবশ্য কানেই যায়নি আরজি কর হাসপাতালের (RG Kar Hospital) লিফটম্যান এবং নিরাপত্তারক্ষীদের। কাজের সময়ে মোবাইলে গান চালিয়ে ফুর্তিতে মেতে উঠেছিলেন তাঁরা! হাসপাতালের লিফটে আটকে জ'পুরের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের(৪০) মৃত্যুর প্রাথমিক তদন্তে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ঘটনায় ধৃত পাঁচজনকে আদালতে পেশ করে শনিবার নিজেদের হেফাজতে নেন লালবাজারের (LALBAZAR) গোয়েন্দারা।

    সূত্রের খবর, হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারের ওই লিফট গত কয়েক দিন ধরে গোলমাল করলেও তা চালু রাখা হয়েছিল। মৃতের পরিবারের প্রশ্ন, এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তা হলে এমন 'মরণফাঁদ' তৈরির দায় কার? অরূপের মৃত্যুর ঘটনায় লিফটে যে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, তা দুর্ঘটনা থেকে স্পষ্ট। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখছেন, শুধুমাত্র ওই দিন সমস্যা হয়েছিল, নাকি আগে থেকেই লিফটের অবস্থা বেহাল ছিল। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই লিফটে সম্ভবত বিদ্যুৎ সংযোগেরও সমস্যা ছিল। শনিবার ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা যখন লিফট পরীক্ষা করতে এসেছিলেন, সে সময়ে ওই গোলমাল ধরা পড়ে। ফলে, ম‍্যানুয়াল ভাবে লিফটের ওঠা–নামা পরীক্ষা করা হয়। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে লিফটে সেন্সরের সমস্যাও হতে পারে। মৃতের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, 'তা হলে লিফটের গায়ে 'আউট অফ অর্ডার' বোর্ড ঝোলানো ছিল না কেন? লিফটম্যানকে কেন রাখা হয়নি?'

    শুক্রবার ভোর ৪টে ১২ থেকে ৫টা ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে (CCTV Footage) অরূপকে অপারেশন থিয়েটারের সামনে দেখা যায়। দ্বিতীয় ফুটেজে দেখা যায়, তাঁকে লিফটের বাইরে আনা হচ্ছে। ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী, অরূপের স্ত্রী সোনালি দত্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়ানে শনিবার বেশ কিছু নতুন তথ্য সামনে এসেছে। সোনালি এ দিন জানান, ঘটনার রাতে তাঁরা ছেলে আরুষকে নিয়ে প্রথমে ট্রমা কেয়ার বিল্ডিং–এর দোতলায় গিয়েছিলেন। অপারেশন করাতে তাঁদের ৫ তলায় যেতে বলা হয়। সেখানে পৌঁছে ছেলে বাথরুমে যাওয়ার কথা বললে তিনজনে সাততলায় যাওয়ার লিফটে ওঠেন। কারণ, ওখানেই বাথরুম ছিল। কিন্তু সেই লিফট হঠাৎ নীচের দিকে নামতে শুরু করে। অরূপ ফোন করে আত্মীয়দের বিষয়টি জানান। এর পর বেসমেন্টে গিয়ে আচমকা লিফটের দরজা খুলতেই দেখা যায়, সামনে লোহার গ্রিল দিয়ে আটকানো এবং তাতে তালা লাগানো। ফলে অরূপ, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে, কেউই সেখান থেকে বেরোতে পারেননি। এ ভাবে প্রায় এক ঘণ্টা বেসমেন্টে আটকে থাকে লিফট। চিৎকার করলেও হাসপাতালের কর্মী বা পুলিশ কেউ তালা খুলে তাঁদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেননি।

    আতঙ্কের মধ্যেই সকলে হুড়োহুড়ি করে লিফটের দুই দরজার মাঝখান দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন। সোনালি ও আরুষ লিফটের নীচের ফাঁকা অংশে পড়ে যান। আরুষকে কোনও ভাবে তুলে লিফট ও গ্রিলের গেটের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেন সোনালি। এরই মধ্যে আচমকা লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে ফের উপরের দিকে উঠতে থাকে। সে সময়ে দরজায় জামা আটকে যাওয়ায় অরূপের শরীরের একটি অংশ লিফটের ভিতরে এবং বাকি অংশ বাইরে আটকে যায়। লিফট দ্রুত গতিতে উপরের দিকে উঠতে থাকায় বাইরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মারাত্মক জখম হন তিনি। লিফটটি কিছুটা গিয়ে ফের মাঝপথে আটকে যায় এবং কিছুক্ষণ বাদে বেসমেন্টে নেমে যায়। শেষে খবর পেয়ে হাসপাতালের কর্মীরা বেসমেন্ট থেকে তিনজনকেই জখম অবস্থায় উদ্ধার করেন।

    এই ঘটনায় অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানোর মামলা রুজু করে লিফটম্যান মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানসকুমার গুহ এবং নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান ও শুভদীপ দাসকে টালা থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এ দিন আদালতে সওয়াল-জবাবের সময়ে মৃতের পরিবারের আইনজীবী শুভ্রজিৎ দত্তর দাবি, 'শুধু ওই পাঁচজন নয়। বেশ কয়েকজন রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁদের প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনা হোক। বেসমেন্টের বাইরে লোহার দরজায় তালা দেওয়া ছিল। সেখানকার রক্ষী থেকে শুরু করে সিআইএসএফের কাছে অনুরোধ করা হলেও, দরজা ভাঙা যায়নি।' পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, ওই লিফটের বাইরে সুপারভাইজার এবং ম্যানেজারের ফোন নম্বর লেখা ছিল। মৃতের বাবা অমল পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই নম্বরগুলোতে ফোন করা হলেও কেউ রিসিভ করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ঘটনার আগের কয়েকদিনের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।

    এ দিকে, আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ–খুনের পরে লিফট বিপর্যয়ের এই ঘটনায় পুলিশি তদন্ত নিয়ে যাতে কোনও প্রশ্ন না ওঠে, তা নিয়ে হোমিসাইড বিভাগকে সতর্ক করেছেন সদ্যনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ। শনিবার শিয়ালদহ আদালতে সওয়াল-জবাবের সময়ে সরকারি কৌঁসুলি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় বলেন, 'মানুষ যখন মরে যাচ্ছিল, তখন ওঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুর্তি করেছেন। গান শুনেছেন, মানুষ মেরেছেন। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রকে এরা মানুষ মারার যন্ত্র করে দিয়েছেন।' আদালতে অরূপের পরিবারের তরফে আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করে জানান, মৃতের শরীরের ২১টি হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, কত কষ্ট পেয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জানাচ্ছে, অরূপের হাত, পা এবং পাঁজর ভেঙে গিয়েছিল। এমনকী হার্ট, ফুসফুস, যকৃৎ ফেটে গিয়েছিল। সব পক্ষের আইনজীবীদের সওয়াল জবাব শোনার পরে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ধৃতদের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক।

  • Link to this news (এই সময়)