মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে দৃশ্যতই ভিন্ন মেরুর অবস্থান নিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। সেই সঙ্গে বিধানসভা ভোটে তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে লড়াই ঝাঁঝালো ভাবেই বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বের শেষ সপ্তাহে পৌঁছে প্রকাশ্যে এল। কংগ্রেস চাইছে বিষয়টি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক। তৃণমূল নেতৃত্ব আজ জানাচ্ছে, এই নিয়ে ‘অন্য দলগুলির জ্ঞান শোনার’ প্রয়োজন নেই তাদের।
চলতি অধিবেশনে গোড়া থেকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর দাবি, এলপিজি-র সঙ্কটে সাধারণ মানুষের হেনস্থার প্রতিবাদ— তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেস-সহ অন্য বিরোধী দলগুলিকে কাঁধে কাঁধ মেলাতে দেখা গিয়েছে। রাজ্যসভার প্রধান বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খড়্গের ঘরে সকালের বিরোধী সমন্বয় বৈঠকে নিয়মিত হাজিরা দিয়েছেন তৃণমূলের লোকসভার উপনেতা শতাব্দী রায়। আগামিকাল থেকে ওই প্রাতঃকালীন বৈঠকে তৃণমূলের উপস্থিতি আর নিয়মিত থাকবে কি না, তা এখনও স্থির নয়। কিন্তু এটা স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের প্রচার যুদ্ধ এ বার সংসদের বিরোধী রাজনীতিতেওদেখা যাবে।
আজ তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন কংগ্রেস-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের মহিলা সাংসদের সংখ্যা (শতাংশে) তুলে ধরে এবং পাশাপাশি তাঁর দলের পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেছেন, ‘‘মহিলাদের আরও বেশি করে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করানো নিয়ে আমাদের অন্য কোনও দলের জ্ঞান শুনতে হবে না।’’ প্রসঙ্গত, এই সপ্তাহে মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী বিল পাশ করানোর কথা ভাবছে মোদী সরকার। কিন্তু ওই আইনে সংশোধন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর জন্য সরকারের কাছে যথেষ্ট সাংসদ নেই। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবিরের দ্বারস্থ হয়েছে মোদী সরকার। কিন্তু কংগ্রেস এ নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার দাবি তুলেছে। খড়্গে এ ব্যাপারে তৃণমূল-সহ অন্য বিরোধী দলগুলিকে অনুরোধ করেছেন।
এই প্রসঙ্গে ডেরেক বলেন, ‘‘আমরা এই নিয়ে কোনও বৈঠকেই যাব না। মহিলা প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যা করার আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতে কলমে করে দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরা যা করেছি, বাকি দলগুলি তার অর্ধেক করে দেখাক।’’ পরিসংখ্যান তুলে তাঁর বক্তব্য, ‘‘বিজেপিতে ১৫ শতাংশ, কংগ্রেসে ১৬ শতাংশ, ডিএমকে ১৩ শতাংশ, এসপি ১৫ শতাংশ মহিলা সাংসদ রয়েছেন। মহিলা সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ৩৩ শতাংশ। আমাদের কোনও আইন বা বিল ছাড়াই ৩৭ শতাংশ মহিলা সাংসদ রয়েছেন।’’ তৃণমূল নেতা বলেন, ‘‘বাংলায় বিজেপি অঘোষিত জরুরি অবস্থা চালু করেছে। আমরা কোন খাতিরে দিল্লিতে বিজেপির সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনায় বসব?’’
প্রসঙ্গত, কয়েক দিন আগে কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র শামা আহমেদ অভিযোগ তুলেছিলেন, কেরলের বিধানসভায় ৯২টি আসনের মাত্র ৯টিতে মহিলা প্রার্থী দেওয়া নিয়ে। আজ ওই প্রসঙ্গটি মনে করিয়ে দিয়ে তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য, ‘‘আগে নিজেদের দলে মহিলা প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা ভাবুন রাহুল গান্ধী। আমাদের সবার সঙ্গে বসে এই নিয়ে জ্ঞান শোনার কোনও প্রয়োজনই নেই।’’
প্রসঙ্গত, আড়াই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে মোদী সরকার ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বা মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ করিয়েছিল। তাতে লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের বন্দোবস্ত থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। কারণ আইনে বলা ছিল, জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাসের পরেই মহিলাদের আসন সংরক্ষিত হবে। মোদী সরকার এখন নিজেরই আইন সংশোধন করে জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাসের শর্ত তুলে দিতে চাইছে। তা হলে আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন ও তার পরে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন থেকেই ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা যায় এবং একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে মহিলা ভোটব্যাঙ্ককে সদর্থক বার্তা দেওয়া যায়। রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, বিষয়টি যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ তৃণমূলের পক্ষে।
পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোট ব্যাঙ্ক তৃণমূল নেত্রীর বড় শক্তি। ফলে এই নিয়ে নয়াদিল্লিতে শাসক দল সক্রিয় হলে তা কার্যত শাঁখের করাত হবে তৃণমূলের পক্ষে। আবার কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে নীতিগত ভাবে সমর্থন না করলেও ভুল বার্তা যাবে। অথচ কেন্দ্রের পালে এই নিয়ে হাওয়া লাগলে তা রাজ্যে তৃণমূলের জন্য অনভিপ্রেত। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, সেই কারণেই নারী সংরক্ষণ নিয়ে ভিন্ন মেরুর বয়ান তৈরিকরছে তৃণমূল।