টাকা পেতে যেমন বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল, তেমনই সেই টাকা সময়মতো খরচ করে কেন্দ্রকে বিল বা ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট জমা দিতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরকে পুরোদস্তুর নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।
প্রায় টানা এক বছর কাকুতি-মিনতির পরে চলতি গত ফেব্রুয়ারির একেবারে শেষে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (ন্যাশনাল হেল্থ মিশন বা এনএইচএম) ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য রাজ্যকে ৫০২ কোটি টাকা পাঠিয়েছিল। রাজ্যও তার ‘ম্যাচিং ফান্ড’ হিসাবে টাকা ছেড়েছিল। কিন্তু তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, এনএইচএমে পাওয়া টাকা-র ‘ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট’ ৩১ মার্চের মধ্যে দিল্লিকে পাঠাতে হবে। মাত্র ১ মাসের সময়সীমায় সেটা কি রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষে সম্ভব হবে?
সেই আশঙ্কা সত্যি করেই ২০ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের অধিকাংশ মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল কার্যত জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের নামমাত্র টাকার ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করতে পেরেছে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও সংস্থাকে এনএইচএমের ৮২৩ কোটি ৫০ লক্ষ ৭৯৬ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে ২০ মার্চ পর্যন্ত রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর ২৭২ কোটি ৪৭ লক্ষ ২৭ হাজার ৯৮২ টাকা খরচ করতে পারেনি। অর্থাৎ মোট টাকার মাত্র ৬৭% খরচ করাগিয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরে ওষুধ সরবরাহকারী একাধিক সংস্থার অভিযোগ, কেন্দ্র এনএইচএমের টাকা ছাড়ার পরেও তাদের এক-এক জনের এখনও ৩-৫ কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়ে গিয়েছে। রাজ্য তাদের টাকা দিচ্ছে না।
একাধিক মেডিক্যাল কলেজ টাকা খরচের কোনও নথি জমা দিতে পারেনি। তার মধ্যে কলকাতার প্রায় সব মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। হাতে পড়ে রয়েছে সাকুল্যে আর কয়েকটা দিন। তার মধ্যে হিসাব না দিলে বা টাকা খরচ করতে না পারলে হয় ফের কেন্দ্র এনএইচএমের টাকা দেওয়া বন্ধ করবে, নয়তো টাকা ফেরত চলে যাবে। আর তা যদি হয়, তা হলে বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রচারের বড় অস্ত্র হাতে পাবে বিরোধী দল বিজেপি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আঁচ করেই স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম এবং রাজ্যে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অধিকর্তা মৌমিতা গোধারা বসু ইতিমধ্যে একাধিক বার জেলা স্বাস্থ্য অধিকর্তাদের নিয়ে ভিডিয়ো বৈঠক করেছেন। ২০ তারিখের বৈঠকে যে সব হাসপাতাল হিসাব দেওয়ায় বা টাকা খরচে পিছিয়ে রয়েছে, তাদের ভর্ৎসনা করা ও তাড়া দেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর। কিন্তু অবস্থা যা, তাতে কি রাজ্য পুরো হিসাব সময়মতো দিয়ে উঠতে পারবে? স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের কথায়, ‘‘সবাইকে বলা হয়েছে। সবাই চেষ্টা করছেন যাতে সময়ের মধ্যে ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেটদেওয়া যায়।’’
স্বাস্থ্যকর্তাদের মতে, আগে এনএইচএমের টাকা সরাসরি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজের অ্যাকাউন্টে ঢুকত। কিন্তু এখন কেন্দ্র নিয়ম করেছে, ট্রেজ়ারি মারফত টাকা দেওয়া হবে। এনএইচএমের নির্দিষ্ট পোর্টালে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বিল বা ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট আপলোড করলে তা যাচাই করে কেন্দ্র সবুজসঙ্কেত দিলে ট্রেজ়ারি টাকা ছাড়বে। এই নিয়মের গেরোতেই টাকা দ্রুত খরচ করা যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত, ২০২২-২৩ সাল থেকেই জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের টাকা প্রথম বন্ধ করে কেন্দ্র। সেই সময় রাজ্যের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল টাকা নয়ছয়ের। ২০২২-২৩ সালে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের টাকা খরচের যে অডিট হয়, সেখানেও আর্থিক নয়ছয়ের চিত্র উঠে এসেছিল বলে কেন্দ্রের দাবি।