• শমীক দল সামলাতে পারছেন না, সরতে বলুন, আমি সভাপতি হচ্ছি! দাবিপত্র জমা হল বিজেপি দফতরে, চিঠি রাষ্ট্রপতি ভবনেও
    আনন্দবাজার | ২৩ মার্চ ২০২৬
  • গত কয়েক বছর ধরেই তিনি বুঝতে পারছেন, এ রাজ্যে বিজেপির উত্থান তাঁকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই রাজ্য বিজেপির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে তিনি বার বার এগিয়ে আসছেন। লেখালিখি, দৌড়ঝাঁপ, তদ্বির-তদারক সবই করছেন! কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি তাঁকে কিছুতেই সভাপতি পদে বসার সুযোগ দিচ্ছে না।

    রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন সুকান্ত মজুমদার তাও দেখা করেছিলেন দলের এই সম্ভাব্য ‘উদ্ধারকর্তা’র সঙ্গে। কিন্তু বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সেটুকুও করেননি। বাধ্য হয়ে রাজ্য দফতরে লিখিত ভাবে নিজের দাবি পেশ করেছেন বিশ্বনাথ দাস। এবং সেখানেই থেমে থাকেননি। রাষ্ট্রপতি ভবনেও একই দাবি জানিয়ে চিঠি জমা করে এসেছেন তিনি।

    বিশ্বনাথের বাড়ি নদিয়ার হরিণঘাটা থানা এলাকার চণ্ডীরামপুরে। ছোটবেলা অবশ্য কলকাতায় কেটেছে। ওয়াটগঞ্জ থানা এলাকায় তাঁর বাবার স্বর্ণালঙ্কারের ব্যবসা ছিল বলে বিশ্বনাথ জানাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সে দোকান বাবার মৃত্যুর পরে বেহাত হয়ে যায়। মামলা করে আমি জিতেছি। কিন্তু দোকানের দখল এখনও পাইনি। আমার কোনও আয় নেই।’’ পৈতৃক দোকান তথা ব্যবসার দখল ফিরে পেতে ব্যর্থ হলেও রাজ্য বিজেপির ‘দখল’ নিতে তিনি তৎপর। সে তৎপরতা বছর দুয়েক আগে থেকে শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ হল গত সপ্তাহে রাজ্য বিজেপির বিধাননগর দফতরে আরও একবার হানা দেওয়া এবং রাজ্য সভাপতি পদে বসার দাবি লিখিত ভাবে পেশ করে যাওয়া।

    গত সপ্তাহে বিশ্বনাথ যখন একটি প্লাস্টিকের ফোল্ডার বগলদাবা করে বিজেপি দফতরে আসেন, তখন রাজ্য বিজেপির-ই কোনও এক ‘রসিক’ পদাধিকারী তাঁকে সযত্নে পথ দেখিয়ে সহ-সভাপতি প্রবাল রাহার ঘরে পৌঁছে দেন। বিশ্বনাথের কথাবার্তা তথা দাবিদাওয়ার ‘গুরুত্ব’ আঁচ করেই তেমনটা করা হয়েছিল। প্রবালও ‘রসবোধ’-এর পরিচয় দেন এবং বিশ্বনাথকে আর এক সহ-সভাপতি অমিতাভ রায়ের ঘরের দরজা চিনিয়ে দেন। কিছুক্ষণ বিশ্বনাথের সঙ্গে কথা অমিতাভ ‘বিষয়টি বুঝে নেন’। তার পরে গম্ভীর মুখে বিশ্বনাথকে পৌঁছে দেন রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক শশী অগ্নিহোত্রীর ঘরে। শশীই যে তাঁর সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, বিশ্বনাথের তা ‘বুঝতে’ অসুবিধা হয়নি। ফলে তিনি নিজের এ যাবৎ দৌড়ঝাঁপের বিশদ তথ্য শশীর সামনে তুলে ধরতে শুরু করেন।

    ঘটনার সাক্ষীরা জানাচ্ছেন, শশী শুরুতে মন দিয়েই বিশ্বনাথের কথা শুনছিলেন। কিন্তু বিশ্বনাথ অনেকক্ষণ ধরে পুরনো কথা বলতে থাকায় শশী তাঁকে থামিয়ে অল্প কথায় মূল বিষয়টি জানাতে বলেন। তখন বিশ্বনাথ জানান, শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে রাজ্য বিজেপির উত্থান হবে বলে তিনি মনে করছেন না। তাই শমীককে সরিয়ে তিনি নিজে রাজ্য সভাপতি পদে বসতে চান এবং দলটাকে তুলে আনতে চান।

    বিশ্বনাথের এই বাক্যটি শুনে শশী প্রথমে প্রায় আঁতকেই উঠেছিলেন। তাই দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করে বুঝে নিতে চান, তিনি ঠিক শুনেছেন কি না। বিশ্বনাথ দ্বিতীয় বারেও একই কথা বলেন। কয়েক সেকেন্ড থমকে যান শশী। তার পরে স্থিতধী ভঙ্গিতে ফের বাক্যালাপ শুরু করেন। বিশ্বনাথের লিখিত দাবিপত্র তিনি গ্রহণ করেন এবং ‘আশ্বস্ত’ করেন এই বলে যে, শমীকের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। বলেন, ‘‘ঠিক আছে, চিঠিটা আমার কাছে রইল। আমি একবার শমীকদার সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি যদি সরে যেতে রাজি হন, তা হলে আপনি চলে আসবেন।’’

    তবে বর্তমান রাজ্য সভাপতির সঙ্গে এখনও দেখা করতে না-পেরে বিশ্বনাথ বিড়ম্বনাতেই রয়েছেন। শিয়রে নির্বাচন। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। এখনই দলের দায়িত্ব হাতে নিতে হলে নির্বাচনে দলটাকে তুলে আনা যাবে কী করে, সে সব ভেবেই বিশ্বনাথের ‘টেনশন’ বাড়ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তদানীন্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে বিশ্বনাথ দেখা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘সুকান্তবাবু আমাকে বলেছিলেন, এখন তো সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ হলে আপনাকে জানাব। তার পরে আমি দিল্লি চলে গিয়েছিলাম। চিঠি লিখেই নিয়ে গিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতি ভবনে সে চিঠি জমাও করি। কিন্তু ডাক এল না। দিল্লিতে থাকতে থাকতে শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ১৮ থেকে নেমে ১২ হয়ে গিয়েছে। তাই ফিরে এলাম। এখন আমি দায়িত্ব না-নিলে আর হবে না।’’

    বিশ্বনাথের বাড়িতে মা, ভাই, ভ্রাতৃবধূ এবং দুই ভ্রাতুষ্পুত্র রয়েছেন। ভাই চাষাবাদ করেন। মায়ের কানের দুল বন্ধক রেখে বিশ্বনাথ দিল্লি গিয়েছিলেন। সেখানে বছরখানেক একটি বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে ‘নিরাপদে’ নেই, তা বুঝেই দিল্লি থেকে ফিরে এসেছেন।

    আপাতত বিশ্বনাথ অপেক্ষা করছেন। সভাপতিত্বের ডাক আসার অপেক্ষা। সভাপতি হলে তাঁর এই উপার্জনহীন দশা কেটে যাবে বলেও চিঠিতে লিখেছেন বিশ্বনাথ!
  • Link to this news (আনন্দবাজার)