ফুল ফুটেছে, তবু আজ বসন্ত নয়! শীতের পর থেকেই সরাসরি গ্রীষ্ম শুরু হয়ে যাচ্ছে দেশের বিস্তীর্ণ প্রান্তে, পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় তাই
আনন্দবাজার | ২৩ মার্চ ২০২৬
মুশকিলে পড়তেন রবীন্দ্রনাথ। এখনও নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগছে। ফুটছে শিমুল, পলাশ। কিন্তু যে ফাগুন হাওয়ার প্রেমে বসন্তকে নিয়ে প্রায় শ’খানেক গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই মধুর বসন্ত আর নেই। এই ঋতু উবে যাচ্ছে প্রায় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকেই।
আবহাওয়াবিদদের মতে, গত বছরের মতো এ বারও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হঠাৎ শীত বিদায় নিয়ে এসে গিয়েছে গ্রীষ্ম। দেশের অধিকাংশ স্থানেই। তবে বিশেষত পশ্চিম ও উত্তর ভারতে। কোথাও কোথাও প্রায় কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই হানা দিয়েছে তাপপ্রবাহ। মার্চের ১০ তারিখ মুম্বইয়ে তাপমাত্রা উঠে গিয়েছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭.৬ ডিগ্রি বেশি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’। মার্চের প্রথম দু’সপ্তাহে হিমাচল প্রদেশেরও কিছু এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি। দিল্লিও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে। স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি বেশি। এমনকি, রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি থাকছে। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভও পড়েছে তাপপ্রবাহের কবলে।
অসুবিধা কি শুধু কবির? শীত মিটতে না মিটতেই তাপ্রবাহের এই ঘটনা আগামী কয়েক মাসের জন্য তো বটেই, আসলে দীর্ঘমেয়াদী অশনি সঙ্কেতও দিচ্ছে, বলছেন আবহাওয়াবিদেরা। একে তো শীত ছোট হচ্ছে। উপরন্তু বসন্ত উবে যাওয়ার অর্থ সুদীর্ঘ, তীব্র দাবদাহের কাল। জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জলসম্পদ এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা—সব কিছুর ওপরই বিরূপ প্রভাব ফেলবে এই পরিস্থিতি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দিন তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি থাকবে।
এই প্রবণতা অবশ্য সর্বত্র সমান নয়। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বসন্ত একেবারে উধাও হয়ে গেলেও পুর্বাঞ্চলে এ বছর বসন্তের হালকা প্রভাব ছিল। আনন্দবাজার ডট কম-কে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান হবিবুর রহমান বিশ্বাস বলেছেন, “গত বছর পশ্চিমবাংলায় বসন্ত আসেনি। শীত থেকে সরাসরি গ্রীষ্ম। এ বার বসন্তের খানিকটা প্রভাব ছিল।” তবে তাঁর মতে, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা ও চরম ভাব, দুই’ই যে ভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী বছরেও বসন্ত বাতাসের ছোঁয়া পাওয়া যাবে, এমনটা নিশ্চিত বলা যায় না।
বসন্ত একেবারেই ছোট হয়ে যাওয়ায় সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মার্চ-এপ্রিল মাসেই তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইসমাইল মণ্ডলের বক্তব্য, ‘‘এ বছর যে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহেও রাজ্যে অধিকাংশ এলাকায় আবহাওয়া খানিকটা মনোরম, তার মূল কারণ বঙ্গোপসাগরের ওপর একটি নিম্নচাপ বলয়ের উপস্থিতি।’’ তাঁর মতে, জলবায়ুর উষ্ণায়ন ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি। এর ফলে একদিকে শহরাঞ্চলে তাপজনিত মানসিক ও শারীরিক চাপ ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষত কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে। এর সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা মিলে তাপজনিত অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। এ ছাড়া, রাতের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দিনের বেলার তীব্র তাপ থেকে স্বস্তি বা শক্তি পুনরুদ্ধারের যে সুযোগ শরীর পেত, সেই সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে কৃষি ও বাস্তুতন্ত্র। বসন্ত তো দেশ জুড়ে উৎসবের মাস। অনেক উৎসবই ফসল তোলার সঙ্গে যুক্ত। তা ছাড়া, রঙে রঙে ভরে ওঠে অরণ্য। ডালে ডালে নতুন পাতা, তাতে কত বাহারি রং। কিন্তু ইসমাইলের কথায়, ‘‘ফসল উৎপাদন বা ফুলের প্রস্ফূটন, সব চক্রই ব্যাহত হবে ফাল্গুনের দাবদাহে।”
দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলিতে এখনই উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া লক্ষ্যণীয়। এমনই পর্যবেক্ষণ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা ‘ক্লাইমেট ট্রেন্ড’-এর। এর থেকে আগামিদিনে আপেক্ষিক আর্দ্রতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর পরিণতি অত্যন্ত গুমোট ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া। উপকূল থেকে কলকাতা দুরত্ব বেশি না হওয়ায় এই প্রভাব আসবে শহরেও।
বসন্ত নিয়ে লিখতে গেলেই কাব্য চলে আসে। ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’, লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কেন? বসন্তের মূল আবেদন হল তার মৃদুতা। না তীব্র শীত, না গরম, না প্রবল বর্ষণ। চারিদিকে নতুন রং। গরমের ক্লান্তিকর দিনগুলি শুরুর আগে একটু মেদুরতা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্যই হলো তীব্রতা বা উগ্রতা। বসন্ত হাপিস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা এমন সময়ে, যখন আসলে ‘লা নিনা’ পরিস্থিতি চলছে। এই প্রাকৃতিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের জলের উপরিতলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকায় ভারতীয় উপমহাদেশ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঝড়বৃষ্টি ও ঠাণ্ডার প্রকোপ বাড়ে। সেই পরিস্থিতিও বাঁচাতে পারেনি ঋতুর রানিকে। ২০২৫ সালটি ছিল নথিভুক্ত তাপমাত্রার ইতিহাসে তৃতীয় উষ্ণতম। ২০২০ থেকে ২০২৫-’২৬ পর্যন্ত চার বার ‘লা নিনা’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিবারই সে উষ্ণায়নের কাছে হেরে গিয়েছে। এই পরাজয় যথেষ্ট উদ্বেগে রাখছে আবহাওয়াবিদদের।
ভারতের ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লা নিনার প্রভাবকে ছাপিয়ে গিয়েছে। বাংলার ক্ষেত্রে বিপদটা বড়ই। বস্তুত, বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির মধ্যে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবণতা অনুযায়ী এ বারেও হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলি, পশ্চিমে সিন্ধু বা পুর্বে গাঙ্গেয় সমভূমি, সর্বত্রই শীতকালীন বৃষ্টিপাত বা তুষারপাতের পরিমাণ ছিল নগণ্য। একেবারে জানুয়ারির শেষে এসে বেশ কিছুটা বৃষ্টিপাত হয় একদফায়। ফেব্রুয়ারিতে আবার প্রায় বৃষ্টিই হয়নি। ঘাটতি ৮১ শতাংশ। এদিকে মার্চের শেষ লগ্নে দার্জিলিঙে নেমে এল অকাল তুষারপাত। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, নিম্নচাপ কাটলেই রাজ্য জুড়ে প্রবল গরমের আশঙ্কা থাকছে।
বসন্তের ছোঁয়া আসার আগেই দিনেরবেলা প্রচণ্ড গরম শুরু হয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারও। তাঁর মতে, এ রাজ্যে ফসলের ওপর এর কী দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে, সেটা এখনই বলা মুশকিল। কারণ আবহাওয়ার নতুন ‘প্যাটার্ন’টা এখনও স্পষ্ট হয়নি। তবে তাঁর কথায়, “আবহাওয়ার নানা খামখেয়ালিপনার কারণে পুর্বাভাস সম্পর্কে আমরা এখন অনেক সতর্ক থাকি এবং সেই অনুযায়ী কৃষকদের সচেতন করার কাজ ধারাবাহিক ভাবে চলে।”
পরিবেশ থেকে মেদুরতা চলে গেলে কি তা বিদায় নেবে মনোজগত থেকেও? চাইলে মানসিক ভাবেই বসন্ত এনে ফেলা যায়, বসন্তের জন্য ঋতুর উপরে নির্ভর করে থাকতে হয় না। লিখেছিলেন কবি জয় গোস্বামী । বলেছিলেন মনের চিরবসন্তের কথা। এখন থেকে অবশ্য মানসিক ভাবেই বসন্ত আনার অভ্যাস করতে হবে। সেটাই প্রকৃতির ইঙ্গিত।