পশ্চিমবঙ্গে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে? অফিসার বদলির ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠল হাই কোর্টে, কেন সিদ্ধান্ত, কী বলল কমিশন
আনন্দবাজার | ২৩ মার্চ ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের আধিকারিকদের অপসারণের প্রক্রিয়া নিয়ে এ বার প্রশ্ন উঠল হাই কোর্টে। বদলির ধরন দেখে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে কি না। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে এ ভাবে বদলি করা যায়। অন্য দিকে কী কারণে বদলি করা হচ্ছে, তা নিয়ে কমিশনও নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে হাই কোর্টে।
রাজ্যে ভোট ঘোষণার পর থেকে একের পর এক আমলা এবং পুলিশকর্তাকে বদলি করেছে কমিশন। তা নিয়ে হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী অর্ককুমার নাগ। সোমবার হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। মামলাকারীর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী কল্যাণ। আধিকারিক অপসারণ নিয়ে কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন কমিশনের এক্তিয়ার নিয়েও।
গত ১৫ মার্চ রাজ্যে ভোট ঘোষণা হয়েছে। ওই রাতেই রাজ্যের মুখ্যসচিবের পদ থেকে নন্দিনী চক্রবর্তীকে সরিয়ে দেয় কমিশন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিবের পদ থেকে সরানো হয় জগদীশপ্রসাদ মীনাকেও। সেই প্রসঙ্গে কল্যাণ আদালতে বলেন, “রাতারাতি আধিকারিকদের অপসারণ করা হয়েছে। মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে কোনও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র সরিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সমস্যা মুখ্যসচিব দেখছেন। তাঁকে সরিয়ে দিল। স্বরাষ্ট্রসচিব নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁকে শুধু সরিয়েই দেয়নি, অন্য রাজ্যে পাঠিয়ে দিয়েছে।”
নন্দিনী, জগদীশপ্রসাদকে দিয়ে যে তালিকা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী কয়েক দিনে ক্রমশ দীর্ঘ হয়েছে। দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে একের পর এক আধিকারিক এবং পুলিশকর্তাকে। কী উদ্দেশ্যে এই বদলিগুলি করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কল্যাণ। তাঁর সওয়াল, “পঞ্চায়েত দফতরের সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক? জাভেদ শামিমের মতো দক্ষ অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারকে সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি এক মাস হল দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁকে সরানোর পিছনে কারণ কী?”
প্রধান বিচারপতির এজলাসে কল্যাণের প্রশ্ন, কমিশন কি ইচ্ছাকৃত ভাবে এমন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে? তাঁর যুক্তি, এসআইআর-এর সময় থেকে আধিকারিকদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে কমিশন। এসআইআর-এর সময় ওই আধিকারিকদের কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেনি কমিশন। সে ক্ষেত্রে এখন ভোট ঘোষণা হওয়ার পরে কেন আধিকারিকদের হঠাৎ অপসারণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন কল্যাণের। তাঁর বক্তব্য, শুধু পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোনও রাজ্যে এমন হয়নি। কল্যাণ আরও সওয়াল করেন, রাজ্যে সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ (রাষ্ট্রপতি শাসন) জারি হলে এই ভাবে বদলি করা যায়। তা হলে কি রাজ্যে ৩৫৬ অনুচ্ছেদ জারি হয়েছে? প্রশ্ন তোলেন কল্যাণ।
কত জন আধিকারিককে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, সেই পরিসংখ্যানও আদালতে তুলে ধরেন মামলাকারীর আইনজীবী। তিনি বলেন, “৬৩ জন পুলিশ অফিসার, ১৬ জন আইএএস অফিসার এবং ১৩ জন পুলিশ সুপারকে সরিয়ে দিয়েছে। বেশির ভাগ অফিসারকে কোনও দায়িত্ব দেয়নি। এই সব অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদি কোনও বিপর্যয় হয়, কে সামলাবে?”
মামলায় রাজ্যের হয়ে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। তিনিও কমিশনের বদলির ধরনের বিরোধিতা করেন। অ্যাডভোকেট জেনারেলের সওয়াল, কমিশনকে কি এমন সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনের কাজে যুক্ত নন, এমন আধিকারিকদেরও অপসারণ করতে পারবে?
তবে কমিশনও এ ক্ষেত্রে আধিকারিকদের বদলির প্রসঙ্গে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে প্রধান বিচারপতির এজলাসে। কমিশনের আইনজীবী বলেন, “নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে, এটা বলছি না। কোনও সাংবিধানিক সংস্থার প্রচুর ক্ষমতা থাকে, এমন নয়। তবে কোনও কিছু পরিচালনার জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “অবাধ এবং সুষ্ঠু ভোট পরিচালনার জন্য এমন পদক্ষেপ করা হয়েছে। এই সব সিদ্ধান্তের নেপথ্যে অনেক কারণ রয়েছে। পাঁচটি রাজ্যে ভোট হচ্ছে, সব জায়গায় পরিস্থিতি এক নয়। অন্যত্রও অফিসার বদলি করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হয়।”
কমিশনের আইনজীবী বোঝাতে চান, পশ্চিমবঙ্গের মতো ভোটমুখী অন্য রাজ্যগুলিতেও আধিকারিকদের বদলি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “যে সব রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে সেখানে অফিসারদের বদলির তালিকা আমরা দিচ্ছি। পাঁচ রাজ্যের ভোটের জন্য বিভিন্ন রাজ্য থেকে অফিসার নিয়ে আসা হয়েছে সেই তালিকাও আমরা দিচ্ছি।” এই জনস্বার্থ মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কমিশনের আইনজীবী। কমিশনের বক্তব্য, মামলাকারী একজন আইনজীবী। তিনি রাজ্য সরকারের হয়ে সওয়াল করেন। সরকারের আইনজীবীদের প্যানেলেও রয়েছেন তিনি। সে ক্ষেত্রে একজন সরকারি কৌঁসুলি জনস্বার্থ মামলা করতে পারেন না বলেই আদালতে জানান কমিশনের আইনজীবী। আগামী বুধবার ফের এই মামলাটি শুনবে আদালত।