• আরজি করে হৃদ্‌যন্ত্র-ফুসফুস বিকল হয়ে মৃত্যু প্রৌঢ় রোগীর! ‘মানবিক সিদ্ধান্ত’ হয়নি বলে ব্যবস্থার আশ্বাস অতীনের
    আনন্দবাজার | ২৩ মার্চ ২০২৬
  • আরজি করের ট্রমা কেয়ারে সোমবার আর এক প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়েছে। সেই মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ময়নাতদন্ত যিনি করেছেন, সেই চিকিৎসক পুলিশকে জানিয়েছেন, প্রৌঢ় ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছিল হৃদ্‌যন্ত্র-ফুসফুস বিকল (কার্ডিও-রেসপিরেটরি ফেলিওর) হওয়ার কারণে। পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তে জানা গিয়েছে বিশ্বজিৎ সামন্ত নামের ওই প্রৌঢ় মদ্যপান করতেন। এই ঘটনায় যদিও চিকিৎসক এবং হাসপাতালের কর্মীদের দিকে পরোক্ষে আঙুল তুলেছেন আরজি করের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য তথা বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষ। তিনি জানিয়েছেন, ওই রোগীকে নীচের তলায় চিকিৎসকদের শৌচালয় ব্যবহার করতে না-দেওয়া ‘মানবিক সিদ্ধান্ত’ হয়নি। তিনি এই ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

    আরজি করের ট্রমা কেয়ারে হাঁটতে গিয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েন ৬১ বছরের বিশ্বজিৎ। তার পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, শৌচালয়ে যাওয়ার জন্য স্ট্রেচারটুকুও মেলেনি। হাসপাতালের অব্যবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন তাঁরা। প্রৌঢ়ের ময়নাতদন্ত করেছেন যে চিকিৎসক, তিনি জানান, কার্ডিও-রেসপিরেটরি ফেলিওরই তাঁর মৃত্যুর কারণ। টালা থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, নাক, মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বলে বিশ্বজিৎকে আরজি কর হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁর পুত্র। হাসপাতালের ইএমও তাঁকে দেখেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়। সোমবার ভোর ৪টে ৫৫ মিনিট নাগাদ তিনি শৌচালয়ে যান পুত্রের সঙ্গে। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে আবার ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে যান তাঁর পুত্র। সেখানে অন-ডিউটি চিকিৎসক তাঁর চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, ওই ব্যক্তি মদ্যপান করতেন।

    অন্য দিকে, অতীন মনে করেন, এই ঘটনায় হাসপাতালের আরও ‘মানবিক’ হওয়া উচিত ছিল। মৃতের পরিবারের সদস্যেরা জানিয়েছেন, শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে আরজি করে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন বিশ্বজিৎ। তাঁর নাক থেকে রক্তও পড়ছিল। রাতে প্রাথমিক চিকিৎসায় রক্ত বন্ধ হয়। অতীনের প্রশ্ন, নাক দিয়ে রক্ত পড়ার পরেও কেন তাঁকে হাঁটিয়ে শৌচালয়ে পাঠানো হল। তিনি বলেন, ‘‘ব্লিডিং হচ্ছে মানে গুরুতর। (রোগীর যেখানে চিকিৎসা চলছিল) নীচতলায় স্টাফ নার্সদের শৌচালয় ছিল। রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে ওই শৌচালয় ব্যবহার করতে দেওয়া যেত।’’

    প্রশ্ন উঠেছে, রোগীর যেখানে চিকিৎসা চলছিল, তার আশপাশে কেন শৌচালয় ছিল না? অতীন জানান, যেখানে রোগীর চিকিৎসা চলছিল, সেই তলায় যে শৌচালয় রয়েছে, তার নীচের তলায় ওই জায়গায় রেডিয়েশনের যন্ত্র রয়েছে। উপরের তলায় শৌচালয় দিয়ে জল পড়ছে। নীচের তলায় যন্ত্রটি বাঁচাতে তাই উপরের তলার শৌচালয় বন্ধ রাখা হয়েছে। পিডব্লিউডি খুঁজে পাচ্ছে না কোথা থেকে জল লিক করছে। এর পরেই অতীন প্রশ্ন তোলেন, রোগীর যেখানে চিকিৎসা চলছিল, সেখানে হাসপাতাল কর্মীদের শৌচালয় থাকা সত্ত্বেও কেন সেটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘ট্রমা কেয়ার থেকে রোগীকে যদি বাইরে যেতেই হয়, তা হলে তাঁর অবস্থা দেখে একটি নার্স, আয়াকে পাঠানো যেত। এটা বিভাগের দোষ। ব্যবস্থা নিতে হবে।’’

    অতীন আরও বলেন, ‘‘রোগীর অবস্থা ডাক্তার ভাল জাজ করবেন। নাক দিয়ে ব্লিডিং মানে সেরিব্রাল হয়েছে। সেকেন্ড অ্যাটাকের সম্ভাবনা থাকে। সেই ক্রিটিকাল রোগী হেঁটে দূরে শৌচালয়ে যাবেন? মনে করি না মানবিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।’’ অতীন প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘অস্থায়ী শৌচালয়ের ব্যবস্থাই বা কেন করা হয়নি? আমি কথা বলব।’’ এর পরেই তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁর কথায়, ‘‘স্বাস্থ্য ভবন থেকে অনুমোদন নিয়ে আসতে হবে জরুরি বিভাগে মেরামতির কাজ শুরু করার জন্য। আমি শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি তুলব। অনুমতি নিয়ে আসব। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে কথা বলব। চার হাজার রোগী সামলানোর মতো পরিষেবা ট্রমা কেয়ারে নেই। ফলে দ্রুত ইমার্জেন্সিটা চালু করতে হবে।’’ প্রসঙ্গত, আরজি কর হাসপাতালে এক চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় সেখানে ঢুকে বহিরাগতেরা ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ। জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালানো হয়। তার পর থেকে ট্রমা কেয়ার ভবনেই জরুরি বিভাগের কাজ চলছে। সেই জরুরি বিভাগ মেরামতি নিয়েই কথা বলেছেন অতীন।

    রোগীর পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে যেখানে প্রৌঢ়ের চিকিৎসা চলছিল, সেখানে কাছাকাছি কোনও শৌচালয় ছিল না। কর্মীদের জিজ্ঞাসা করা হলে বাইরে বা দোতলায় নিয়ে যেতে বলা হয়। দোতলায় ওঠার জন্য স্ট্রেচারও দেওয়া হয়নি। অসুস্থ অবস্থায় হেঁটে হেঁটে দোতলার শৌচালয়ে যেতে গিয়েই প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়েছে, দাবি তাঁর পরিজনদের।

    গত শুক্রবার ভোরে আরজি করের এই ট্রমা কেয়ার ভবনের লিফ্‌টে আটকে মৃত্যু হয়েছে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেখানেও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল শৌচালয়। তিন বছরের ছেলের চিকিৎসা করানোর জন্য আরজি করে গিয়েছিলেন অরূপ। শিশু শৌচালয়ে যেতে চেয়েছিল। হাতের কাছে শৌচালয় না-থাকায় লিফ্‌টে উঠতে হয় তাঁদের। অভিযোগ, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেই লিফ্‌ট চলে গিয়েছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বেসমেন্টে দীর্ঘ ক্ষণ আটকে থাকেন অরূপেরা। লিফ্‌টের দরজায় আটকে সিমেন্টের দেওয়ালের সঙ্গে ঘষটে মৃত্যু হয় অরূপের।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)