• বিধানসভা ভোটে মূল ইস্যু বেহাল নাগরিক পরিষেবা
    এই সময় | ২৪ মার্চ ২০২৬
  • সৌমিত্র ঘোষ

    ভোটের দামামা বাজতে না বাজতেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। পুরোদস্তুর প্রচারে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। দলীয় কর্মীদের নিয়ে বৈঠক, বাড়ি বাড়ি জনসংযোগ, মিটিং–মিছিল, এক কথায় প্রচারে কোনও খামতি রাখছেন না প্রার্থীরা। এ বারের বিধানসভা ভোটে সরকারি উন্নয়নকেই তুরুপের তাস করছে শাসকদল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথীর মতো রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পকে প্রচারের হাতিয়ার করছেন তৃণমূলের (TMC) প্রার্থীরা। ভোটের দিন ঘোষণার আগে ইমাম, মোয়াজ্জেম ও পুরোহিত ভাতা বাড়ানো এবং সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ (DA NEWS) দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এ সব দিয়ে হাওড়ার ভোটারদের মন কি ভিজবে? তা নিয়ে হাওড়ার তৃণমূল নেতাদের মধ্যেই তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

    হাওড়া ও বালির তৃণমূল নেতারা জানাচ্ছেন, বিধানসভা ভোটের প্রচারে বেরিয়ে তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সরকারের উন্নয়নকে প্রচারের হাতিয়ার করলেও বেহাল নাগরিক পরিষেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ শাসকদলকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। জনসংযোগে বেরিয়ে সেই ক্ষোভের আঁচ পেতে শুরু করেছেন তৃণমূলের প্রার্থীরা। দীর্ঘ বছর ধরে হাওড়া ও বালি পুরসভার (Howrah and Bali Municipality) ভোট না হওয়া, জঞ্জাল ও নিকাশি সমস্যা এবং রাস্তাঘাটের বেহাল দশা নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ভোটাররা। হাওয়া বুঝে এ বারের বিধানসভা ভোটে হাওড়া ও বালি, দুই জায়গাতেই পুরসভার ব্যর্থতাকেই প্রচারের অভিমুখ করছেন বিরোধীরা। হাওড়ার এক তৃণমূল নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রীর কথায়, ‘পুরবোর্ড না থাকায় মানুষের নাগরিক পরিষেবা পেতে সমস্যা হচ্ছে, এটা ঠিকই। জনসংযোগে বেরিয়ে আমরা সেটা এখন ভালোই টের পাচ্ছি।’

    রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, হাও়ডা ও বালি পুরসভার ব্যর্থতা আসন্ন বিধানসভা ভোটে ভালোরকম প্রভাব ফেলতে পারে। তার কারণ, দুই পুরসভাতেই নাগরিক পরিষেবা নিয়ে বিস্তর অভাব অভিযোগ রয়েছে। হাওড়া ও বালি, দুই জায়গাতেই গত আটবছর ধরে কোনও পুরবোর্ড নেই। ফলে নেই কোনও পুর প্রতিনিধি। হাওড়ায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আর বালিতে শেষ পুরসভা নির্বাচন হয়েছে ২০১০ সালে। ২০১৫ সালে বালি পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হলে বালিকে হাওড়া পুরসভার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করে বালিতে ১৬টি ওয়ার্ডে উপনির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু ৩ বছরের জন্য বালিতে না ছিল কোনও এমআইসি অথবা বরো কমিটি। ২০২১ সালে অর্ডিন্যান্স জারি করে বালিকে ফের হাওড়া থেকে আলাদা করে বালির পুরসভাকে পৃথক করা হলেও নির্বাচিত পুর বোর্ডের অভাবে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন নাগরিকরা।

    কর্মী সঙ্কটের জেরেও ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক পরিষেবা। রাস্তা সংস্কার, জঞ্জাল পরিস্কার থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর আদায়, জমি–বাড়ির প্ল্যান অনুমোদন, ফ্ল্যাটের মিউটেশন, সমস্ত কাজই চলছে ঢিমেতালে। কখনও সরকারি আধিকারিক, কখনও আবার স্থানীয় বিধায়ককে পুর প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ করা হলেও তাতে পরিষেবার মান বাড়েনি। রাস্তা মেরামত থেকে জঞ্জাল সাফাই, যে কোনও বড় উন্নয়ন কাজের জন্য কেএমডিএ–এর মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে দুই পুরসভাকেই। ফলে পুর পরিষেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তার প্রভাব বিধানসভা ভোটে পড়বে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তৃণমূল নেতারা। সম্ভবত, সেই কারণেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরের দিনই এলাকায় জঞ্জাল সাফাই করতে নেমে পড়েছিলেন বালির তৃণমূল প্রার্থী কৈলাস মিশ্র। তিনি সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আগে কাজ, পরে প্রচার।’

    বিজেপির রাজ্য সম্পাদক উমেশ রাই বলেন, ‘দেশের মধ্যে সবচেয়ে নোংরা শহরের তকমা পেয়েছে হাওড়া। আবর্জনা, জল জমা, রাস্তাঘাট, পানীয় জল সবেতেই ব্যর্থ হাওড়া পুরসভা। বালিতেও কোনও কাজ হয়নি। মন্ত্রী, বিধায়করাই তো পুরসভার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরাও ব্যর্থ। ভোটে তো প্রভাব পড়বেই। হাওড়া ও বালিতে এটা ভোটের অন্যতম বড় ইস্যু।’ যদিও বালির তৃণমূল প্রার্থী কৈলাস মিশ্র হাওড়া ও বালি পুরসভার এই অচলাবস্থার জন্য প্রকারান্তরে বিজেপিকেই দায়ী করেছেন। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যপাল দীর্ঘদিন বিল আটকে রাখার জন্যই হাওড়া ও বালি পুরসভার নির্বাচন করা যায়নি। বিধানসভা ভোট মিটে গেলেই তিন মাসের মধ্যে পুর নির্বাচন হবে এবং সমস্যার অবসান ঘটবে।’

  • Link to this news (এই সময়)