এই সময়: চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু ওরা যে একেবারে নতুন একটা প্রজাতি — এমনটা নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করে দিল ডিএনএ (DNA) বার কোডিং প্রযুক্তি। দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন জ়ুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Zoological Survey of India) (জ়েডএসআই)–এর গবেষকরা। সেই সূত্রেই মহারাষ্ট্রের পুনের নাথাচিওয়াড়ি এলাকায় কৃষিজমিতে আরশোলার একটি নতুন প্রজাতির খোঁজ পাওয়া গেল। নতুন এই প্রজাতিটির বিজ্ঞানসম্মত নাম নিওলোবোপটেরা পেনিনসুলারিস দেওয়া হয়েছে। ভারতে এই প্রথম ডিএনএ বার কোডিং পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে আরশোলার নতুন কোনও প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেল।
প্রবীণা ট্রেনযাত্রী কোচ অ্যাটেন্ডেন্টের কাছে অভিযোগ করছিলেন, ‘বহুত আরশোলা হ্যায়। ফুরফুর ফুরফুর করকে উড়তা হ্যায় অউর গায়ে মে বসতা হ্যায় ...’ একেবারে নিরীহ প্রকৃতির হলেও এমন যখন–তখন ফুরফুর করে উড়ে বেড়ানো আর গায়ে বসে পড়ার অভ্যাসের জন্যই আরশোলা প্রায় সবারই অত্যন্ত অপছন্দের পাত্র। বিশেষ করে মহিলাদের। কিন্তু পতঙ্গবিশেষজ্ঞরা (এনটোমোলজিস্ট) এর ব্যতিক্রম। তাঁদের কাছে আরশোলা বিশেষ কৌতূহলের বিষয়। তাঁদের মতে পৃথিবীতে আরশোলার প্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ভারতে পাওয়া যায় অন্তত ১৯০ প্রজাতির আরশোলা। এ দেশে অবশ্য আপাত বিরক্তিকর এই পতঙ্গ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল আড়াইশো বছরেরও আগে — ১৭৫৮ সাল থেকে।
তবে গত ২৬৮ বছরে এই প্রথমবার আরশোলার একটি নতুন প্রজাতিকে ‘সমন্বিত শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি’ (ইন্টিগ্রেটিভ ট্যাক্সোনমিক অ্যাপ্রোচ) ব্যবহার করে বর্ণনা করা হয়েছে বলে জানাচ্ছে জ়েডএসআই। এটি ভারতের জীববৈচিত্র্য নথিভুক্ত করার পদ্ধতির পথে ঐতিহাসিক পরিবর্তন বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। জ়েডএসআই পুনের প্রধান বসুদেব ত্রিপাঠী এই আবিষ্কার প্রসঙ্গে বলেন, ‘এট শুধুই শুরু। জ়েডএসআই–এর ওয়েস্টার্ন রিজিওনাল সেন্টার খুব দ্রুত ১০০-র বেশি নতুন ডিএনএ বারকোড প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে বহু নতুন তথ্য সামনে আসতে চলেছে।’ শবনম আনসারি এবং কে পি দিনেশ–কে প্রধান লেখক হিসেবে রেখে এম সেনরাজ, সাহিল শিকালগার ও রশ্মি মোরে–র যে গবেষক দলটি এই নতুন প্রজাতির খোঁজ পেয়েছে, তাঁদের পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্রটি ইতিমধ্যেই রেকর্ডস অফ দ্য জ়ুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সংস্থার অধিকর্তা ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায় এই গবেষণাকে ‘ভারতে পাওয়া আরশোলাদের শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ডিএনএ বারকোডিং–এর ব্যবহার ভারতীয় জীববিদ্যা–সংক্রান্ত গবেষণাকে নতুন দিশা দেখাতে শুরু করেছে।’
পুনের কৃষিজমিতে পাওয়া এই আরশোলাকে নতুন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ডিএনএ বারকোডিং ছাড়াও বাহ্যিক গঠন ও বৈশিষ্ট্যের বিশদ পর্যবেক্ষণ, জননাঙ্গের গঠন ও ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, নতুন প্রজাতির এই পতঙ্গটির বিজ্ঞানসম্মত নামের ‘পেনিনসুলারিস’ অংশটি উপদ্বীপীয় ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলে এর উপস্থিতি নির্দেশ করে। এই আবিষ্কারের আগে ভারতে এই গণের মাত্র দুটি প্রজাতির কথা জানা ছিল। ১৮৬৫ ও ১৯৯৫ সালে তাদের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। জ়েডএসআই জানাচ্ছে, ভারতে পাওয়া আরশোলার প্রায় ৫০ শতাংশ প্রজাতিই পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই গবেষণাটি জ়েডএসআই (পুনে ও চেন্নাই শাখা) এবং প্রফেসর রামকৃষ্ণ মোরে আর্টস, কমার্স অ্যান্ড সায়েন্স কলেজ-এর যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে।