• সদ্যোজাতের ওজন ৫.৫ কেজি, নয়া নজির সরকারি হাসপাতালে, কেমন আছেন মা?
    এই সময় | ২৪ মার্চ ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    অন্নপ্রাশনের সময়েও অধিকাংশ শিশুর এই ওজন হয় না। পুরো সাড়ে পাঁচ কেজি। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও মধ্য কলকাতার লেডি ডাফরিন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে (Lady Dufferin Victoria Hospital) এই ওজন নিয়েই রবিবার রাতে জন্মেছে এক নবজাতক। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে ম্যাক্রোসোমিয়া (Macrosomia)। যা রীতিমতো বিরল।

    আলট্রাসোনোগ্রাফির (Ultrasonography) কল্যাণে চিকিৎসকরা আগে থেকেই জানতেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজনের শিশুই পৃথিবীর আলো দেখতে চলেছে। ঝুঁকির ডেলিভারি হতে চলেছে বুঝে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও সেরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রবিবার রাত ৯টা নাগাদ একরত্তি ছেলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে তাকে ওজন মাপার যন্ত্রে তুলে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় চিকিৎসকদেরও— ৫ কেজি ৫৪৫ গ্রাম। ভয়ঙ্কর ঝুঁকির সিজ়ারের ঝক্কি পেরিয়ে আপাতত অবশ্য ভালো আছে মা ও সদ্যোজাত। রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে এত বেশি ওজনের শিশু এর আগে জন্মেছে কি না, তা মনে করতে পারছেন না কেউ।

    চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, রাজ্যে প্রায় চার দশক আগে সম্ভবত এক সদ্যোজাত ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এত ওজন নিয়ে। কিন্তু তার কোনও রেকর্ড নেই। তবে গত জানুয়ারিতে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ৪ কেজি ৮২০ গ্রাম ওজনের এক শিশু জন্মেছিল। তা-ও আবার নর্মাল ডেলিভারির মাধ্যমে। সারা দেশের মধ্যেসবচেয়ে বেশি ওজনের (৬ কেজি ৮০০ গ্রাম) শিশু ২০১৬-তে জন্মেছিল কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে (Bengaluru)।

    হাসপাতাল সূত্রে খবর, মধ্য কলকাতার মল্লিকবাজার এলাকার বছর বত্রিশের নাজি়য়া পারভিনকে রবিবারই ভর্তি করা হয়। গত ৯ মাস তাঁর অ্যান্টিন্যাটাল চেক-আপও হয়েছে লেডি ডাফরিনেই। গর্ভাবস্থাকালীন কোনও আলাদা সমস্যা না থাকলেও চিকিৎসকদের চিন্তা ছিল ওবেসিটির শিকার নাজ়িয়ার অত্যধিক ওজন (৯১ কেজি) ও ডায়াবিটিস। তাই ম্যাক্রোসোমাটিক বেবি বা বড় আকারের শিশুর সম্ভাবনা থাকায় চিকিৎসকরা আগেই সতর্ক ছিলেন। রবিবার ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঝুঁকির সিজ়ারিয়ান সেকশন অস্ত্রোপচারটি নিপুণ ভাবে হয় হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নিবেদিতা পালের তত্ত্বাবধানে। সোমবার রাতের দিকে নাজ়িয়ার অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়।

    হাসপাতালের সুপার জয়ব্রতী মুখোপাধ্যায় জানান, ফিটাল ম্যাক্রোসোমিয়ার ক্ষেত্রে বেবিকে মায়ের পেট থেকে বের করার পদ্ধতিটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নর্মাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে। গর্ভস্থ শিশুর মাথা বেরিয়ে এলেও অনেক সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চওড়া কাঁধ আটকে যায়, যাকে বলে শোল্ডার ডিস্টোশিয়া। জন্মের সময়ে অন্যান্য শারীরিক আঘাতের আশঙ্কাও থাকে। মায়ের শারীরিক ট্রমা এবং নবজাতকের শ্বাসকষ্টের মতো ঝুঁকিও থাকে অনেক সময়ে। নাজ়িয়ার আগের সন্তান স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমেই হয়েছিল বছর দশেক আগে। কিন্তু এ বার নর্মাল ডেলিভারির বদলে সিজ়ার করে অন্যান্য আশঙ্কা অনেকাংশ নির্মূল করলেও রয়ে যায় আরও একটি মারাত্মক ঝুঁকি— অনিয়ন্ত্রিত পোস্ট-পার্টাম হেমারেজ বা প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। অনেক ক্ষেত্রেই তা মায়ের জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকির জন্ম দেয়।

    নিবেদিতা জানান, স্বাভাবিকের চেয়ে বেবি অনেক বেশি বড় হওয়ার কারণে, তাকে গর্ভ থেকে বের করে নেওয়ার পরেও মায়ের জরায়ুর পর্যাপ্ত সঙ্কোচন ঠিকমতো হয় না। আর তার জেরেই হয় মাত্রাতিরিক্ত প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ। তাই এ ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা সন্তুষ্ট, শেষ পর্যন্ত নিপুণ দক্ষতায় পুরো প্রক্রিয়া ভালোয় ভালোয় মিটে গিয়েছে। সোমবার মায়ের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। এমনিতে কোনও বড় সমস্যা না থাকলেও নবজাতককে বিশেষ পর্যবেক্ষণের জন্য স্পেশ্যাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়েছে, যাতে কোনও সম্ভাব্য জটিলতা দ্রুত সামাল দেওয়া যায়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আজ, মঙ্গলবার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে সদ্যোজাতের ইকোকার্ডিয়োগ্রাফি ও চেস্ট এক্স-রে হবে বলে জানিয়েছেন লেডি ডাফরিনের চিকিৎসকরা।

  • Link to this news (এই সময়)