গিয়েছিলেন প্রার্থী হওয়ার জন্য আবেদন জমা দিতে, ফোন এল, প্রার্থিপদে নাম ঘোষণা হয়েছে তাঁর! বিরল আনন্দ নারায়ণের
আনন্দবাজার | ২৪ মার্চ ২০২৬
বসন্তের বেলা পশ্চিমে গড়িয়েছে। বিধাননগরের সেক্টরফাইভে বিজেপির রাজ্য দফতরের সামনে জমজমাট ভিড়েও খানিক ভাটার টান। সকালেরউৎসাহ-উদ্দীপনা বিকেলে খানিক কমেছে। সে সবের মধ্যেই গাড়ি থেকে নামলেন এক প্রবীণ।পড়ন্তবেলার মতো শরীর-স্বাস্থ্যও পড়ন্ত, ঈষৎ অশক্ত। এক সতীর্থকে সঙ্গে নিয়ে গুটিগুটি ঢুকলেন বিজেপি দফতরে। এসেছেন সতীর্থকে প্রার্থী করার আর্জি পেশ করতে এবংসম্ভব হলে নিজের প্রার্থিপদের আবেদনটিও জমা দিয়ে যেতে।
কাজের মাঝেই বার বার ফোন বেজে উঠছিল কলকাতা হাইকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট নারায়ণচন্দ্র মণ্ডলের। প্রবীণ আইনজীবী নিজে তো বটেই, তাঁরসঙ্গীও বিরক্ত হচ্ছিলেন। শেষমেশ ফোন ধরে নারায়ণ যা শুনলেন, তা চমকপ্রদ!
নারায়ণের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক অনেক পুরনো। ২০২১সালে বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। হেরেছিলেন তোবটেই। তৃতীয় হয়েছিলেন। তার পরে আরও পাঁচটা বছর কেটে গিয়েছে। নারায়ণের বয়স সত্তরছাড়িয়েছে। চালচলনে তার ছাপ বয়সের চেয়েও বেশি পড়েছে। এ হেন নারায়ণ গত ১৬ মার্চযাঁকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি দফতরে ঢুকেছিলেন, তিনিও পেশায় আইনজীবী। আমডাঙা বিধানসভাকেন্দ্র থেকে তিনি প্রার্থী হতে চান। রাজ্য দফতরে নারায়ণের দীর্ঘ পরিচিতি কাজেলাগিয়ে তিনি নিজের আবেদনটি মসৃণ ভাবে জমা করাতে এসেছিলেন। কোন ঘরে, কার কাছে আবেদনজমা করতে হবে, সে সব নারায়ণ জানেন। নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছে প্রার্থিপদের আবেদন জমানেওয়ার আর্জিও জানিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিজেপি দফতর তাঁদের জানায়, প্রার্থীহওয়ার আবেদন জমা নেওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে।
কথাটা ঠিকই। যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়ে আবেদন করছিলেনবা যাঁদের নাম বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, তাঁদের নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গেকেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের বৈঠক তার আগেই হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি আসনের জন্য তিন-চারটিনামের তালিকা হাতে নিয়ে রাজ্য নেতৃত্ব তার পরে দিল্লি যান। সেখানে জেপি নড্ডারবাড়িতে দু’দফা বৈঠক করে আসনপ্রতি একটি করে নাম বেছে নেওয়ার কাজও সারা। তার পরেপ্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাড়িতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির বৈঠকে শ’দেড়েকআসনে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়ে গিয়েছে। বাকি শুধু ঘোষণা। সে কথাই নারায়ণ এবংতাঁর সঙ্গীকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন রাজ্য স্তরের দুই পদাধিকারী।
কিন্তু নারায়ণ সে সব শুনতে নারাজ। সঙ্গীর আবেদন তো তিনিজমা করাবেনই। সঙ্গে নিজের জন্যও তদ্বির শুরু করেছেন। বারবার বলছেন, তাঁর নিজেরজন্য কোনও আবেদন তখনও জমা পড়েনি। আবেদন জমা না দিয়ে ফিরবেন না, এমনওমনস্থ করছেন। কিন্তু বারবার তাঁর ফোন বাজছে। সবই পরিচিতদের ফোন। নারায়ণ কোনওটাধরছেন না। কোনওটা ধরে দরজার বাইরে গিয়ে বলে আসছেন, পরে ফোন করবেন। তবু ফোন বাজছেই। পরিস্থিতি দেখে নারায়ণেরসঙ্গীর খানিক বিরক্তি, ‘‘এত বার ফোন বাজছে কেন!’’
নারায়ণ বিব্রত। যাঁকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, তাঁর কাজসুষ্ঠু ভাবে মেটাতে পারছেন না। নিজের কাজটাও করে উঠতে পারছেন না। আবার ফোন বাজল। এ বার তাঁরপুত্র। এ ফোন তো ধরতেই হয়। নারায়ণ ফোন ধরলেন এবং একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করে জানতেচাইলেন, বলেই তো এসেছেন যে, জরুরি কাজে বিজেপি দফতরে এসেছেন! কেন সকলে বারবার ফোনকরছে!
জবাব যা শুনলেন, তার জন্য সম্ভবত নারায়ণ তৈরি ছিলেননা— বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থিতালিকা দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এবং সেইতালিকায় বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম রয়েছে! খবরশুনে যথারীতি বিস্মিত নারায়ণ। পরে বলছিলেন, ‘‘সত্যিইজানি না, কী ভাবে আমার নাম ঘোষিত হল। পার্টি অফিসে বসে ফোনটা পেয়ে অবাকইহয়েছিলাম!’’
তবে তাঁর চেয়েও বেশি অবাক হয়েছিলেন তাঁর সঙ্গী। যেনারায়ণ অতক্ষণ পাশে বসে আক্ষেপ করছিলেন প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা দিতে পারেননিবলে, তাঁর নামই প্রার্থী হিসাবে ঘোষিত হয়ে গেল! বিস্মিত হয়েছিলেন ঘটনাস্থলে হাজির সকলেই।আবেদন না-জানানো সত্ত্বেও কী করে প্রার্থী হলেন নারায়ণ?
বিজেপি সূত্রে নানা ব্যাখ্যা মিলছে। অনেকের মতে, নারায়ণআগেও বসিরহাট উত্তরে বিজেপির টিকিটে লড়েছেন বলে সমীক্ষায় তাঁর নাম উঠে এসে থাকতেপারে। কেউ কেউ বলছেন, বিকল্প মুখ খুঁজে না-পেয়ে সংগঠনের তরফে ফের নারায়ণের নামইপাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অনেকে আবার বলছেন, নারায়ণ নিজে হয়তো স্থানীয় স্তরেআবেদন জানিয়েছিলেন বা ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু দলের রাজ্য দফতরে পৌঁছে আবেদনজমা না-দিলে এ বার টিকিট মিলবে কি না, সে বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন না। তাই আরওএকবার আবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
তার অবশ্য প্রয়োজন পড়েনি। আবেদন জমা দেওয়ার আগেইঅভিনন্দন বার্তা পেয়ে গিয়েছেন নারায়ণ। ৪ মে ভোটগণনার দিনও কি তিনি এমনই কোনও ‘বিস্ময়করআনন্দ’ পাবেন?