• হাতখরচ বাঁচিয়ে গরিব ছাত্রদের বইখাতা কিনে দিতেন সিপিএম প্রার্থী নবনীতা
    এই সময় | ২৪ মার্চ ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, শ্রীরামপুর

    বাবা সোমনাথ চক্রবর্তী ছিলেন মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের শিক্ষক। সমাজের গরিবগুর্বো মানুষের কল্যাণের অংশীদার হবেন, এই আশা নিয়েই বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেই সুবাদেই শ্রীরামপুরে (Sreerampore) চাতরা গোস্বামী পাড়ায় বামপন্থী নেতা-কর্মীদের যাতায়াত লেগেই ছিল। বাবাকে কাছ থেকে দেখার সুবাদেই আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য কিছু করার ঝোঁক তৈরি হয়। স্কুল-কলেজে পড়তে পড়তেই গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের নিখরচায় টিউশন পড়িয়েছেন। মাঝে মাঝেই হাতখরচ বাঁচিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বইখাতাও কিনে দিয়েছেন। সেই লক্ষ্য নিয়েই সমাজ বদল করতে শ্রীরামপুরে কাস্তে-হাতুড়ি ও তারা চিহ্ন নিয়ে প্রথম বার বিধানসভা ভোটে সিপিএম (CPIM) প্রার্থী হয়েছেন নবনীতা চক্রবর্তী (Nabanita Chakraborty)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে নবনীতাকে এ বারের ভোটে বাজি ধরেছে বামেরা।

    ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নবনীতা সক্রিয় ভাবে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, ২০১৫ থেকে ধাপে ধাপে দলে নিজেকে তুলে ধরেছেন। রাজ্যে পালা বদলের পরে যখন বামপন্থী তথা সিপিএম ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু ও দুর্বল, তা সত্ত্বেও নিজেকে সিপিএমের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রসায়ন জানতে চাওয়ায় নবনীতার স্পষ্ট জবাব, 'বামপন্থীরা সুবিধাবাদী রাজনীতি করে না। একটা নীতি, আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যায়। বাবাকে দেখেছি, শিক্ষকতা করার পাশাপাশি, একটি একটি করে বই চেয়ে-চিনতে এনে নেতাজি পাঠাগার তৈরি করেছেন। যে সব ছেলেমেয়ে বইয়ের অভাবে পড়তে পারত না, বাবা কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় বই দিয়ে পাশে থেকেছেন। প্রান্তিক মানুষের জন্য এই আকুলতা একমাত্র বামপন্থীদের মধ্যেই থাকে। আমিও সেই বিশ্বাসেই এগিয়ে চলেছি।' শ্রীরামপুর কলেজে পড়ার সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন নবনীতা। এসএফআই (SFI) সংগঠনের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য অধিকার লড়াইয়ে গলা তুলেছেন। কলেজ শেষ করে মাস্টার ডিগ্রি করার সময়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি করেছেন।

    বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (Burdwan University) থেকে বিএড করার সময়েও থেমে থাকেননি। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বামপন্থীদের মতোই লড়াই করেছেন। জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্যপদ পেয়েছেন। অভয়াকাণ্ডে রাজপথে নেমে অধিকার রক্ষার লড়াই করেছেন। নবনীতার কথায়, 'সেখানে কোনও রকম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। এ ছাড়া, নারী সুরক্ষার জন্য আমাদের লড়াই চলবে। পরিবারে মা ও ছোট বোন আছে। ভোটের ময়দানে জেতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী আমি। কারণ, আমি মনে করি, মানুষ পরিবর্তনশীল। জনগণ সচেতন। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের আছে।" রাজনীতি না করলে অন্য কী করতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে একগাল হেসে দিয়ে নবনীতা বলেন, 'আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের হকের জন্য আজীবন লড়াই করব বলেই আমার জন্ম হয়েছে। আমি অন্তত সেটাই মনে করি।' বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকায়, দীন্সিতা ধর ও নবনীতা চক্রবর্তী কাছাকাছি দলীয় সংগঠনের হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। বয়সের ফারাক খুব বেশি না থাকায়, দলের সর্বক্ষণের উঠতি মহিলা কর্মী হিসেবে দু'জনের সম্পর্কের রসায়ন পার্টি কমরেডদের চাঙ্গা করেছিল। গত লোকসভা ভোটে শ্রীরামপুর কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী হন দীপ্সিতা ধর। ওই নির্বাচনে দীন্সিতার নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন নবনীতা। সে সময়ে ভোট-প্রচারে সর্বক্ষণ দীন্সিতার ছায়াসঙ্গী ছিলেন তিনি। তাঁকেই এ বার প্রার্থী করে চমক দিতে চেয়েছেন আলিমুদ্দিনের কর্তারা। শ্রীরামপুরের এক বর্ষীয়াণ সিপিএম নেতার কথায়, 'নবনীতার ব্যবহার ও হাসিমুখের সারল্য প্রবীণ ও নবীন-পার্টির সর্বস্তরের কর্মী ও সমর্থকদের মন জয় করে নিয়েছে। নবনীতাকে দেখলেই মনে হয়, ও যেন আমাদের ঘরের মেয়ে। বলতে পারেন, এটাই ওঁর ইউএসপি।'

  • Link to this news (এই সময়)