এই সময়, হাওড়া: হাওড়ার বার্ন স্ট্যান্ডার্ড (Burn Standard) কারখানায় কাজ করতেন রবিন চট্টোপাধ্যায়। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর চাকরি চলে যায়। তার পরে বিভিন্ন ছোটখাট শিল্প কারখানায় কাজ করে কোনও রকমে কিছু দিন দিন গুজরান করেন। বর্তমানে এক রকম অসহায় অবস্থায় চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। একই ভাবে, উত্তর হাওড়ার সালকিয়ার (Salkia) হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করতেন বিধান চক্রবর্তী। কয়েক মাস ধরে তাঁর হাতেও কোনও কাজ নেই। ছোটখাটো কাজের জন্য ঘুরছেন বিধান। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে কর্মহীন ঘুসুড়ি জুট মিলের কর্মী সুফন হালদার। এ রকম আরও বহু শ্রমিক আছেন, যাঁদের কারখানা বন্ধ হওয়ার পরে জীবিকা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অনেকেরই একবেলা খাবার জোটাতে সমস্যা হচ্ছে, অসহায় ও অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটছে বহু পরিবারের। হাওড়া শহরের বহু কলকারখানার শ্রমিক এখন একটাই প্রত্যাশা করছেন- এমন একটি সরকার আসুক, যারা কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং নতুন করে শিল্প কারখানা গড়ে তুলবে। শিল্পশহর হিসেবে পরিচিত হাওড়ার সেই পুরোনো গৌরব আজ অনেকটাই স্নান। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধাক্কা লেগেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ গোটা হাওড়া জুড়েই বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর এই পরিস্থিতিই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে।
উত্তর হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী উমেশ রাই ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, 'বন্ধ কারখানার প্রশ্নেই আমরা ভোটে লড়ব।' তিনি দাবি করেন, 'উত্তর হাওড়া এক সময়ে ছোট ও মাঝারি শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। ধর্মতলা রোড, ঘুসুড়ি, কালী মজুমদার রোড-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শিল্প ইউনিট। লোহা ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, বিভিন্ন রোলিং মিল, বরফ কল, সব মিলিয়ে এলাকা ছিল অত্যন্ত কর্মচঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।' স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক তোলাবাজির কারণে বহু শিল্পপতি কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। হুগলি ডক, তারা রোলিং মিল, শঙ্কর রোলিং মিল, রাজস্থান রোলিং মিল, বরফ কল এইসব কারখানার নাম এখন শুধু অতীতের স্মৃতি। ফলে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। শুধু উত্তর হাওড়া নয়, মধ্য হাওড়া ও শিবপুর এলাকাতেও একই ছবি ধরা পড়েছে। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, যেমন ইন্ডিয়ান মেশিনারি, রেমিংটন র্যান্ড ছাড়াও একাধিক ফ্লাওয়ার মিল ও জুট মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরও বেড়েছে। এক সময়ে দাশনগরকে বলা হতো 'প্রাচ্যের শেফিল্ড'।
লোহা ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের জন্য বিখ্যাত এই এলাকা এখন কার্যত শিল্পহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপানউতোরও বাড়ছে। বিজেপির দাবি, তারা ক্ষমতায় এলে বন্ধ কারখানাগুলি পুনরায় চালু করায় উদ্যোগী হবে এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করবে। উমেশ রাইয়ের কথায়, 'হাওড়ার হারানো কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।' অন্য দিকে, শাসকদল তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জেলার মন্ত্রী অরূপ রায়ের দাবি, রাজ্যে শিল্পের প্রসার ঘটেছে এবং নতুন বিনিয়োগ এসেছে। তাঁর মতে, 'শিল্পের ধরন বদলাচ্ছে। পুরোনো শিল্পের জায়গায় নতুন ধরনের শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্র গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আরও উপযোগী।' তবে সাধারণ শ্রমিকদের কাছে এই রাজনৈতিক তর্ক তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাঁদের একটাই চাহিদা- স্থায়ী কাজ ও নিয়মিত আয়। অনেকেই বলছেন, 'রাজনীতি বোঝার সময় নেই, আমাদের কাজ চাই।' জেলার এক শিল্প কর্ণধারের কথায়, 'হাওড়ার মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।'