অগ্নিমূল্য প্লাস্টিকে, প্যাকেজিং খরচ দ্বিগুণের বেশি, রাতারাতি দাম বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের, ভিলেন পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ
বর্তমান | ২৪ মার্চ ২০২৬
বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: পুজোর আগে বেশকিছু খাদ্যদ্রব্য ও ভোগ্যপণ্যের উপর জিএসটির বোঝা কিছুটা লাঘব করেছিল কেন্দ্র। কেনাকাটার সময় তার সুরাহা পেয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই সুখ হয়তো আর সইবে না। এমনই আশঙ্কা দানা বাঁধছে। তার কারণ, ইরান বনাম আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেভাবে প্লাস্টিকের দাম বেড়েছে, তার জেরে প্যাকেজিংয়ের খরচ দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছে। ফলে রাতারাতি বদলে যেতে শুরু করেছে বেশ কিছু পণ্যের দাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারি, ফুড প্রসেসিং শিল্পের উপর ইতিমধ্যেই তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভোগ্যপণ্যের দামও না বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। আশঙ্কা, প্যাকেটজাত করার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তা যদি কোম্পানিগুলি নিজেরা বহন না করে, তাহলে দুধ, বোতলবন্দি জল, বিস্কুট থেকে শুরু করে সিংহভাগ প্যাকেটজাত খাবারের দাম বাড়বে। মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটতে বাধ্য হবে মুদিখানা দ্রব্যও।
সমস্যা কোথায়? প্লাস্টিকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির সংগঠন ইন্ডিয়ান প্লাস্টিকস অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছে, অস্বাভাবিক হারে পলিমারের দাম বেড়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে কাঁচামালের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। যুদ্ধের জেরে কাঁচামাল এসে পৌঁছাচ্ছে না। পলিথিন, পলিপ্রপিলিন, পিভিসি, পেট থেকে শুরু করে সব ধরনের প্লাস্টিকের একপ্রকার আকাল শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতি প্রদীপ নায়ার বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। যেহেতু প্রায় সবরকমের পণ্যের প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়, তাই আমাদের আশঙ্কা, তার প্রভাব খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের দামে পড়বে। এদিকে অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি এবং ন্যাপথা অমিল হওয়ার কারণে বোতল, ক্যারিব্যাগ, বাক্স, কৌটোর মতো প্লাস্টিকজাত পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিও চরম সমস্যায় পড়েছে। এরাজ্যে অন্তত আড়াই হাজার সংস্থা রয়েছে, যার সিংহভাগ অসংগঠিত ক্ষেত্রের মধ্যে। তাদের ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই, মনে করছেন প্রদীপ নায়ার। ইন্ডিয়ান প্লাস্টিকস অ্যাসোসিয়েশন কেন্দ্রের কাছে দাবি করেছে, প্রতি ১৫ দিন অন্তর পলিমারের দামের মূল্যায়ন করা হোক। কারণ, যখন খুশি যেমন খুশি দাম বাড়ানো হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যবসায় এঁটে ওঠা যাচ্ছে না।
প্লাস্টিক পণ্য তৈরির মূল উপাদান বিক্রি করে ইন্ডিয়ান অয়েল, রিলায়েন্স বা হলিদয়া পেট্রকেমিক্যালসের মতো সংস্থা। হলদিয়া পেট্রকেম দাবি করেছে, বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তাদের ন্যাপথার অন্যতম জোগান আসে মধ্য প্রাচ্য থেকে। তাদের বক্তব্য, দাম ও কাঁচামালের জোগানের উপর যুদ্ধের প্রভাবের দিকে আমরা সর্বদা নজর রাখছি। আশা করি, যুদ্ধ মিটে যাবে। যদি তা দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকে, তাহলে আমাদের ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হবে।
খোলা বাজারে কতটা প্রভাব পড়েছে? ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিইও আরিফুল ইসলাম বলেন, একটা উদাহরণ দিলেই তা বোঝা যাবে। যে ছোটো কৌটোগুলিতে বেকারি বিস্কুট বিক্রি হয়, তার দাম এক সপ্তাহে আট টাকা বেড়েছে। বিক্রেতা ওই দাম তো ক্রেতার থেকেই আদায় করবেন। এই কদিনে আমরা ১০০ টাকার প্যাকেজিং দ্রব্য ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনেছি। অল ইন্ডিয়া প্যাকেজড ড্রিংকিং ওয়াটার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছে, ইতিমধ্যেই অন্তত দু-হাজার ছোটো সংস্থা তাদের বোতল পিছু এক টাকা দাম বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আরো দাম বাড়তে পারে। মোট কথা, এলপিজির হাত ধরে ইতিমধ্যেই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে রান্নাঘরে। প্লাস্টিকের হাত ধরে গৃহস্থের খরচ বৃদ্ধিতেও সেই ভিলেন হয়ে ফিরতে চলেছে যুদ্ধ।