নন্দীগ্রামে কর্মিসভা শুভেন্দু এবং অভিষেকের, বিরোধী দলনেতার কর্মীদের কাছে আক্ষেপ, ‘আমি মুসলিমদের ভোট চাই, পাই না!’
আনন্দবাজার | ২৬ মার্চ ২০২৬
তিনি শুধু হিন্দুদেরবিধায়ক নন। তেমন দাবিও তিনি কখনওই করেননি। বুধবার নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় বিজেপিরকর্মিসভায় এমনই দাবি করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর মন্তব্য,‘‘আমি কখনও বলিনি, মুসলিমদের ভোট আমি চাই না।আমি বলেছি, আমি পাই না।’’
ঘটনাচক্রে, বুধবার নন্দীগ্রামেতৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও দলীয় কর্মিসভা করেছেন। একইদিনে দুইযুযুধান শিবিরের দুই শীর্ষনেতার কর্মিসভার উপর রাজনৈতিক মহলের নজর ছিল। অভিষেকতাঁর কর্মিসভায় শুভেন্দুর কর্মিসভা বা তাঁকে নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে নন্দীগ্রামেরবিধায়ক শুভেন্দু কর্মিসভার পরে সংবাদমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন, অভিষেকেরকর্মিসভায় যোগদানকারীদের জলটুকুও দেওয়া হয়নি! গত ১৭ মার্চ কলকাতায় অভিষেকেরউপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। বুধবার শুভেন্দুর সভায় নন্দীগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলেরকয়েক জন তৃণমূলকর্মী যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে।
বিধানসভা ভোটেনন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি। সভার শেষ পর্বেসেই প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘‘এ বারে আমি ভবানীপুরেগিয়েছি। মোদীজি পাঠিয়েছেন। আপনারা নন্দীগ্রামের দায়িত্বটা নেবেন। আমি ভবানীপুরেরদায়িত্বটা নিলাম।’’
নন্দীগ্রামেসংখ্যালঘু মুসলিম ভোট আছে। শুভেন্দুর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি ওই ভোট চান। সভারশুরুতেই তিনি বলেন, ‘‘একটা শ্রেণির লোক বলেন, শুভেন্দু অধিকারী বলেন তিনি হিন্দুদের বিধায়ক। আমি এ কথা বলেছি?’’ হিন্দুদের বিধায়ক না হলেও তিনি যে ‘হিন্দুদের ভোটে জেতা বিধায়ক’, সে কথা তার পরেই খোলাখুলি জানিয়ে দেন রাজ্য বিধানসভার বিদায়ী বিরোধীদলনেতা। তাঁর পরিসংখ্যান, ‘‘২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেনন্দীগ্রামে আমি মাত্র ৪০০ মুসলিম ভোট পেয়েছিলাম। মাননীয়া (তৃণমূল প্রার্থী মমতাবন্দ্যোপাধ্যায়) পেয়েছিলেন ৬৪ হাজার মুসলিম ভোট। মিনাক্ষী (সিপিএম প্রার্থীমিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়) ১,২০০। ঐক্যবদ্ধ ভাবে ৬৫ শতাংশ হিন্দু ভোটারের ভোট না পেলেমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাতে পারতাম না।’’ কর্মিসভার বক্তব্যে ২০২১ সালের ভোটপরবর্তী ‘হিংসা’র প্রসঙ্গ তোলেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তৃতায় চলে আসে কেন্দেমারি,তারাচাঁদবাড়, চিল্লোগ্রামে ‘হিন্দুপরিবারগুলির উপর হামলা’র কথা। বাড়ি লুটের কথা। দেবব্রত মাইতির খুনের প্রসঙ্গও। শুভেন্দু দাবি করেন,‘‘আমি আপনাদের মাছ-মাংস খাওয়াতে পারিনি। পাঁচ বছর শান্তিতে রেখেছিআপনাদের।’’
নন্দীগ্রামের বিধায়কহিসাবে তাঁর ‘সব কা সাথ’ ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে শুভেন্দু বুধবার তাঁর সভায় হাজিরসংখ্যালঘু যুবকদের দিকে প্রশ্ন ছুড়েছেন, ‘‘বিধায়ক দফতরে গেলে আমি কখনও জিজ্ঞাসাকরেছি হিন্দু না মুসলমান? এসআইআর-এর সময় রেসিডেন্সিয়ালসার্টিফিকেট কে দিয়েছে?’’ তিনি জানিয়েছেন, বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে নন্দীগ্রামের ৩০০০ মুসলিম কর্মরত। রেয়াপাড়ারসভায় প্রথমে তমলুকের সাংসদ (নন্দীগ্রাম বিধানসভা যে লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত) এবংপরে নন্দীগ্রামের বিধায়ক হিসাবে রেলপ্রকল্প, জেলিংহামের বন্ধকারখানার জমি অধিগ্রহণ, সড়ক ও সেচক্ষেত্রের উন্নয়নে তাঁরভূমিকার কথা তুলে ধরেন শুভেন্দু। পাশাপাশি, জমি আন্দোলনপর্বেতাঁর ভূমিকা এবং ধারাবাহিক ভাবে শহিদ পরিবারগুলির পাশে থাকার দাবিও করেন।
প্রত্যাশিত ভাবেই তৃণমূলসরকারের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের উন্নয়নে ‘ধারাবাহিক অসহযোগিতা’র অভিযোগ তুলেছেনশুভেন্দু। তিনি বলেছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপনাদের সঙ্গেশত্রুতা করেছেন। তিনি ২০২১ সালে যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার একটাও পূরণকরেননি!’’ জলপ্রকল্পের পাইপ না বসিয়ে রাস্তার ধারে ফেলে রাখা থেকে তাঁর সঙ্গেথাকার ‘অপরাধে’ কয়েকটি ‘শহিদ পরিবার’কে মৃত্যুর শংসাপত্র ও সরকারি অর্থসাহায্য নাদেওয়ার অভিযোগও তোলেন শুভেন্দু। তবে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ভাবে সরাসরি ভোট চাইতে শোনা যায়নিতাঁকে। বরং সদ্য বিজেপি-ত্যাগী তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর-সহ সম্ভাব্য অন্য তিনপ্রার্থীর সঙ্গে নিজের নাম উচ্চারণ করে শ্রোতাদের কাছে শুভেন্দু জানতে চেয়েছেন,‘‘এঁদের মধ্যে কে বিধায়ক হওয়ার উপযুক্ত বলে আপনারা মনে করেন?’’সেই সঙ্গেই কর্মিসভা থেকে মহিলাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগামী ১ জুন (ভোটের ফলপ্রকাশ ৪ মে) ৩,০০০ টাকা অ্যাকাউন্টে দেওয়ার এবংআইসিডিএস ও আশাকর্মীদের বেতন বাড়ানোর।