ভোটারে প্রশ্ন, প্রার্থীই বা কারা, প্রতীক্ষা কংগ্রেসে
আনন্দবাজার | ২৬ মার্চ ২০২৬
এক সময়ে অপেক্ষা করছিল বামেরা। কখন কংগ্রেস তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে! বুথ ও ব্লক স্তর থেকে কর্মীদের মতামত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গেদের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে রাজ্যে ২৯৪টি আসনেই লড়াই করার কথা বলে দিয়েছিল কংগ্রেস। এখন অপেক্ষা চলছে, সেই ২৯৪ জন কারা? যাঁরা পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত কংগ্রেসের প্রতীক ও পতাকা নিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে নামবেন।
যুদ্ধের দামামা অবশ্য প্রবল রবে বেজে গিয়েছে আগেই। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ঘোষণার পরের দিনই প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দিয়েছে বামফ্রন্ট ও বিজেপি। তিন দফায় বাম এবং দু’দফায় বিজেপির অধিকাংশ আসনে প্রার্থীদের নাম প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের তিনটি আসন সহযোগী দলকে ছেড়ে দিয়ে বাকি ২৯১ কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ভোটের প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা এখনও আটকে রেয়েছে দিল্লির সিলমোহরের অপেক্ষায়। সূত্রের খবর, আগামী ২৮ মার্চ এআইসিসি-র কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির (সিইসি) বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের প্রার্থী তালিকা অনুমোদিত হতে পারে। তার পরে এক লপ্তেই ২৯৪ কেন্দ্রের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হতে পারে। রাজ্যে দলের স্ক্রিনিং কমিটির সঙ্গে যুক্ত কংগ্রেসের এক কেন্দ্রীয় নেতার ইঙ্গিত, তৃণমূলে টিকিট না-পাওয়া কিছু নেতা যোগাযোগ করছেন। তাঁদের কেউ কেউ কংগ্রেসে শেষ পর্যন্ত যোগ দেবেন কি না, তা-ও এর মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এখনও পর্যন্ত যা পরিস্থিতি, অন্য সব পক্ষ মাঠে নেমে গেলেও তাঁদের প্রার্থী তালিকা সামনে না-আসায় সসেমিরা দশায় পড়েছেন কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা! আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে কেন্দ্র ধরে জনসংযোগ শুরু করাও মুশকিল। দলের এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে কংগ্রেস একাই যথেষ্ট, এই অবস্থান নিয়েছি আমরা। রাজ্যের ২৯৪ কেন্দ্রে দলের পতাকা ওড়ানোর কথা বলেছি। এ বার যখন জোট এবং তার জটিলতা নেই, আমাদের এত দিনে প্রার্থীদের নিয়ে ময়দানে নেমে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে, এর পরে দেওয়াল খুঁজে পাওয়াও কঠিন হবে!’’
প্রার্থী তালিকার নিষ্পত্তি হওয়ার আগে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বিগত কিছু দিন ধরে দিল্লিতে। সেখান থেকেই বিবৃতি দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, ‘‘যে সমস্ত রাজনৈতিক দল প্রার্থী ঘোষণা এবং প্রচার ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে, তাদের থেকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক দায় বহু গুণ বেশি। কংগ্রেস মনে করে, এক জন যোগ্য ভোটারও যদি বাদ থেকে যায়, তবে সেটা ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ না হয়ে গণতন্ত্রের কবর খোঁড়া বা শ্মশান-যাত্রা হয়ে যায়।’’ ভোটার তালিকা ‘বিবেচনাধীন’ রেখে কী ভাবে ভোট হতে পারে— এই প্রশ্ন ফের তুলে তিনি বলেছেন, কংগ্রেস কর্মীদের প্রথম কাজ যোগ্য ভোটারের পাশে থাকা, তার পরে ভোট-যজ্ঞে শামিল হওয়া। প্রদেশ সভাপতির বক্তব্য, ‘‘এখন যাঁরা কংগ্রেসের প্রার্থী হবেন এবং কংগ্রেস কর্মী, তাঁদের কাছে আবেদন রাখছি এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে থাকতে।’’
একা লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে নিতেই নানা ধাক্কাও সামলাতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। মুর্শিদাবাদের লালগোলায় পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি-সহ ৬ কংগ্রেস সদস্য যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। বাম সমর্থন নিয়ে গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে লালগোলা বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। আবার বাম-কংগ্রেস সমঝোতার অন্যতম সমর্থক, কলকাতার লড়াকু পুর-প্রতিনিধি সন্তোষ পাঠক বিধানসভা ভোটের মুখে শেষ মুহূর্তে বিজেপির ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দল ছেড়েছেন বড়বাজার জেলা কংগ্রেস সভাপতি-সহ এক ঝাঁক নেতা। বড়বাজারে সেই শূন্য স্থান ভরাটের চিন্তা করতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। শেষমেশ অধীর চৌধুরী, নেপাল মাহাতো, দীপা দাশমুন্সি, মৌসম বেনজির নূরের মতো নেতা-নেত্রীরা তাঁদের দক্ষতায় কিছু আসন বার করতে পারবেন বলে কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশ আশাবাদী।
পরিস্থিতি দেখে এক কংগ্রেস কর্মীর মন্তব্য, ‘‘নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা নিষ্পত্তি করতে পারছে না, আমাদের প্রার্থী তালিকা বার হচ্ছে না। এই রাজ্যে এ বার সবই কেমন আজব!’’