অর্ধশতবর্ষের বামদুর্গ গলসিতে প্রথম ঘাসফুল ফুটেছিল ২০১৪ বিধানসভা উপনির্বাচনে। তার পরে এক যুগ পেরিয়েছে। ধীরে ধীরে একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তৃণমূলের। কার্যত একদলীয় শাসন চললেও গলসিতে এখনও বন্ধ তৃণমূলের একাধিক কার্যালয়। বিষয়টি ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের অনেকে। তৃণমূলের অন্দরে কানপাতলে ‘সর্ষের মধ্যে ভূতের’ তত্ত্ব শোনা যায় রোজই। তাই দলের কর্মীদের একাংশ কিছুটা উদ্বেগের সুরেই বলছেন, বন্ধ কার্যালয় কি তবে ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
বামেরা ফিকে হওয়ার পরে এখন গলসিতে প্রধান বিরোধী পরিসর দখল করেছে গেরুয়া শিবির। তৃণমূলের অনেকেই মানছেন, দলের অন্দরের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তাদের ঘাঁটিতে সিঁদ কেটেছে বিজেপি। গলসির অনেকেই মনে করছেন, এ বার ভোটে লড়াই মূলত তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির। তবে বামেরা তাদের হারানো জমি কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারে, তা নিয়েও চর্চা রয়েছে। এই আসনটিতে বরাবর বামফ্রন্টের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত ফরওয়ার্ড ব্লক। এ বার প্রার্থী দিয়েছে সিপিএম।
গলসির বিদায়ী বিধায়ক নেপাল ঘড়ুইকে সরিয়ে তৃণমূল এ বার প্রার্থী করেছে অলোককুমার মাঝিতে। গত বার জামালপুর থেকে জিতেছিলেন অলোক। শোনা যায়, কেন্দ্র বদলের নেপথ্যে ছিল গোষ্ঠীকোন্দল। অলোক ফিরে এলেও তাঁর লড়াই খুব সহজ নয় বলে মনে করছেন তাঁর দলের কর্মীদের একাংশ। তৃণমূলের অন্দরে আলোচনা শুনলেই স্পষ্ট হয়, কোন্দল-কাঁটা এখনও বিঁধে রয়েছে গভীরে।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একাংশ বলছেন, কয়েক বছর ধরে কাঁকসা ব্লকের চারটি পঞ্চায়েত আর গলসি ১ ব্লকের বুদবুদ, মানকর আর চাকতেঁতুল পঞ্চায়েত এলাকায় বিজেপির ‘উত্থান’ হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ‘বাড়বাড়ন্তের’ পিছনে রয়েছে তৃণমূলের ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব’। এক সময় গোষ্ঠীকোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে পুরসা, পারাজ, শিড়রাই আর ঘাগড়া অঞ্চল কার্যলয় বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। সেগুলি আজও খোলেনি। দ্বন্দ্বের কারণেই ২০২১ সালে গলসি ছেড়ে যেতে হয়েছিল অলোককে।
অলোকের অবশ্য দাবি, “দলে দ্বন্দ্ব বলে কিছু নেই। ২০১৪ সাল থেকে গলসির মানুষ তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন দেখে গলসির মানুষ আবার তৃণমূলকেই জেতাবে বহু ভোটে। জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
অন্য দিকে, বিজেপিকে ভাবাচ্ছে ‘আদি-নব্য দ্বন্দ্ব’। রয়েছে প্রার্থী নিয়ে চাপা ক্ষোভও। যদিও এর কোনওটি-ই স্বীকার করছে না বিজেপি। জয় নিয়ে আশাবাদী গলসির বাসিন্দা বিজেপি প্রার্থী রাজু পাত্র। তিনি বলেন, “আমি ভূমিপুত্র। আমার নাম যে দিন ঘোষণা করেছে দল, সে দিন থেকেই এই কেন্দ্র জেতার প্রস্তুতি শুরু করেছি।”
এ বার গলসিতে বামফ্রন্টের প্রার্থী সিপিএমের মণিমালা দাস। তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হল, গলসি গ্রামের বাসিন্দা মণিমালার হয়ে এ বার প্রচার শুরু করেছেন সিপিএমের এক ঝাঁক তরুণ মুখ। পথে ঘাটে প্রচারের পাশাপাশি, তাঁরা ‘ঘরের মেয়েকে চাই বলে’ সমাজমাধ্যমে মণিমালার হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। আর মণিমালার দাবি, “শাসক দলের চুরি, দুর্নীতি দেখে এলাকার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। সাম্প্রদায়িক বিজেপিকেও চান না গলসির মানুষ। স্বচ্ছ ভোট হলে এ বার গলসির মাটিতে ফের লালপতাকা উড়বে।”