• ‘রাজ্যবাসী পাশে থাকবেন, তৃণমূলকে উপড়ে ফেলতে পারব’! প্রথম দিন প্রচারে নেমে বললেন আরজি করে নির্যাতিতার মা
    আনন্দবাজার | ২৬ মার্চ ২০২৬
  • প্রচারে তাঁর নিশানা হবে তৃণমূল। রাজ্য থেকে তৃণমূল সরকারকে উৎখাত করাই তাঁর উদ্দেশ্য। বিজেপি তাঁকে পানিহাটির প্রার্থী করার পরে বৃহস্পতিবার প্রথম দিন প্রচারে নেমে এমনটাই জানিয়ে দিলেন আরজি করের নির্যাতিতার মা। রাজ্যে মহিলাদের ‘সুরক্ষা নেই’ বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। প্রচার আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করার আগে স্থানীয় মন্দিরে যান নির্যাতিতার মা। অন্য দিকে, বৃহস্পতিবার তাঁদের পানিহাটির বাড়িতে যান বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, নিজের কেন্দ্রে প্রচারের পরে অন্তত এক বার ভবানীপুরেও যেতে হবে নির্যাতিতার মাকে। সেখানে গিয়ে রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিজের অভিযোগের কথা বলতে হবে। এর পরেই নির্যাতিতার বাবা-মা দাবি করেন, তাঁদের নাম-ছবি-পরিচয় প্রকাশ করতে কোথাও কোনও বাধা নেই। তাঁরা জানান, আদালত এই বিষয়ে ছাড়পত্র দিয়েছে। শুভেন্দুও একই কথা জানান। নির্যাতিতার বাবা বলেন, ‘‘আমরা মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশনকে বিষয়টি জানিয়েছি।’’

    বৃহস্পতিবার সকালে বিধাননগরে বিজেপির রাজ্য দফতরে যান নির্যাতিতার মা। সঙ্গে ছিলেন বিজেপির উত্তর শহরতলি জেলা সভাপতি চণ্ডীচরণ রায়। সেখানে তিনি রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষ করেন। কটাক্ষ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। নির্যাতিতার মা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ দুর্নীতিতে ডুবে রয়েছে, মেয়েদের সুরক্ষা নেই। সম্মান নেই। কোনও কিছু ঘটলে বলা হয়, রাতে মেয়েরা বাইরে বেরোবে না। নাইট ডিউটিদেওয়া হবে না। এ সব কথা যিনি বলেন, তিনি আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী!’’ তার পরেই তিনি জনসাধারণের উদ্দেশে বার্তাদিয়ে বলেন, ‘‘সকলে ভয় না পেয়ে অধিকারগুলির বিষয়ে সচেতন হও।’’

    আরজি করে চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ এবং খুনের প্রতিবাদে রাজ্যেপথে নেমেছিলেন বহু মানুষ। নির্যাতিতার মামনে করেন, আন্দোলনে শামিল হওয়া সেই মানুষজনকে পাশে পাবেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববাসী। রাজ্যবাসী ছিলেন। আমার মেয়ের মৃত্যুকে যে ভাবে তাঁরা নিজের ঘরের মৃত্যু মনে করেছিলেন, সেই ভাবেই তাঁরা আমার পাশে থাকবেন। তৃণমূলকে মূল সমেত উপড়ে ফেলতে পারব। তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হবে।’’ সেই আন্দোলনে শামিল হওয়া কলতান দাশগুপ্ত এখন পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএমের প্রার্থী। প্রতিপক্ষ হলেও কলতানের বিরুদ্ধে কিছু বলবেন না বলেই জানিয়েছেন নির্যাতিতার মা। তিনি বলেন, ‘‘কলতান আমার ছেলের মতো, আন্দোলন করেছে। ওর বিরুদ্ধে কিছু বলব না।’’

    নির্যাতিতার মা মনে করেন, তিনি ভোটে জয়ী হলে আদতে জিতবেন পানিহাটিবাসী। ‘থ্রেট কালচার’-এর বিরুদ্ধে হবে সেই জয়। তাঁর কথায়, ‘‘পানিহাটিবাসীকে বলব,আপনারা জিতবেন, আসুন আমার পাশে। (আমি জিতলে) এটা পানিহাটিবাসীর জয় হবে।’’ এরপরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আবার কটাক্ষ করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘ভয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়। মুখ্যমন্ত্রী থ্রেট কালচার চালান। তার একটা অংশ হল পানিহাটির এক পরিবার, ঘোষ পরিবার। পানিহাটিবাসীকে ভয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়। তাদের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে পানিহাটিবাসীকে বলব, সরব হবেন। নিজেদের লড়াই নিজেরা লড়বেন।’’ পানিহাটিতে এ বার তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষ। সরাসরি নাম না নিয়ে তাঁদেরই নিশানা করেছেন নির্যাতিতার মা।

    বৃহস্পতিবার পানিহাটির দু’-একটি মন্দিরে পুজো দেন নির্যাতিতার মা। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতা-কর্মীরা। ওই বিধানসভা কেন্দ্রের কয়েক জায়গায় প্রার্থীর নাম হিসাবে দেওয়াল লেখা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে নির্যাতিতার বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুভেন্দু আরজি কর-কাণ্ডে রাজ্য সরকারকে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘‘সেই দিন দেহ জোর করে ছিনিয়ে এনেছিল, বাড়ির লোকের অনুমতি না নিয়ে পানিহাটিতে বিদ্যুৎ চুল্লিতে নির্যাতিতার দেহকে প্রমাণহীন করার কাজ করেছিল, দাহ করার জন্য যে অর্থ দিতে হয়, বাড়ির লোককে সেই সুযোগও দেয়নি ওরা। তার পরবর্তী সময়ে সিবিআই মামলা হাতে নেওয়ার আগে পাঁচ দিন ধরে বিনীত গোয়েল, সন্দীপ ঘোষ, অতীন ঘোষেরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশে, তত্ত্বাবধানে প্রমাণ লোপাটের কাজ করেন। অন্যতম চক্রান্তের নায়ক ছিলেন বিনীত গোয়েল। তাঁর হয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করা মেনকা গুরুস্বামীকে তৃণমূল রাজ্যসভার সাংসদ করে পুরস্কৃত করেছে।’’ এর পরে তিনি বলেন, ‘‘সেই মমতা, তাঁর দলকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে বিজেপির প্রার্থিপদ স্বীকার করেছেন নির্যাতিতার মা।’’

    শুভেন্দু জানিয়েছেন, পানিহাটির ‘শিক্ষিত জনতা’ নির্যাতিতার মাকে রেকর্ড ভোটে জয়ী করবেন, যা স্বাধীনতার পরে কখনও হয়নি। তিনি এ-ও জানান, নির্যাতিতার দাদা হিসাবে ‘শর্তহীন’ ভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পরিবার সেই বিষয়টি দেখেছেন। তার পরেই শুভেন্দু জানান, অন্তত এক বার ভবানীপুরে যাবেন। ওই কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। শুভেন্দু জানান, সেখানে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিজের অভিযোগের কথা বলবেন।

    নির্যাতিতার মা জানিয়েছিলেন, তিনি নিজেই পানিহাটিতে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বিজেপির কাছে। আগেই তিনি বলেছিলেন, ‘‘অনেক দিন ধরেই আমাকে প্রার্থী হতে বলা হচ্ছিল। আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু আমি দেখলাম যে, নারীদের নিরাপত্তা, নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে, আর পশ্চিমবঙ্গকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি থেকে মুক্তিদিতে হলে তৃণমূলকে মূল থেকে উপড়ে ফেলা দরকার। তাই আমি বিজেপিতে যোগ দিয়েছি এবংপ্রার্থী হতে রাজি হয়েছি।’’ বিজেপিও সেই কথা স্বীকার করে। শুভেন্দু জানান, তাঁদের প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেবেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। শেষ পর্যন্ত নির্যাতিতার মায়ের নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে বিজেপি।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)