• শেষে বিমানেই অন্ডাল গেলেন মমতা, হুঁশিয়ারি, ‘বাংলায় যে রান্নার গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে, তা যেন বাইরে না যায়’!
    আনন্দবাজার | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • পূর্বনির্ধারিত সূচি মেনে শেষপর্যন্ত শুক্রবার বিমানে চেপেই অন্ডাল গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উড়ানে চাপার আগে কেন্দ্রীয় সরকারকে বার্তা দিলেন, রাজ্যে যে রান্নার গ্যাস উৎপাদিত হয়, তা বাইরে পাঠানো চলবে না। তাঁর আশঙ্কা, ভোটের আবহে জেলাশাসক, পুলিশ অফিসারদের বদলি করে রাজ্যে উৎপাদিত গ্যাস বাইরে পাঠানো হতে পারে। পাশাপাশি মমতা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, পশ্চিমবঙ্গে ভোটের কাজে ভিন্‌রাজ্য থেকে সরকারি কর্মী, জওয়ানেরা আসবেন। তাঁদের রান্নার জন্য এ রাজ্যের মানুষের গ্যাসের জোগান নিয়ে সমস্যা হলে চলবে না। অতিরিক্ত ভোটার তালিকা নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারকে একহাত নিয়েছেন মমতা।

    সূত্রের খবর ছিল, শুক্রবার সড়ক পথে তিনি দুর্গাপুরের উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন। কিন্তু শেষে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুসারে বিমানে চেপেই কলকাতা থেকে অন্ডালের উদ্দেশে রওনা দেন মমতা। তার আগে তিনি বিমানবন্দর চত্বরে দাঁড়িয়ে একের পর এক বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলেন। এলপিজি নিয়ে দেশে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে একহাত নেন নরেন্দ্র মোদী সরকারকে। তাঁর আশঙ্কা, ভোটের আগে রাজ্যের পুলিশ এবং প্রশাসনিক স্তরে রদবদল করে রাজ্যে উৎপাদিত গ্যাস বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যে পেট্রল রয়েছে। (রান্নার) গ্যাসও আছে। ডিএম, পুলিশ অফিসারদের বদলে দিয়ে বাংলার হলদিয়ায় উৎপাদিত গ্যাস বাইরে পাঠানো হোক, তা চাই না।’’ এখানেই থামেন নি তিনি। মমতা আরও বলেন, ‘‘১০ লক্ষ লোক বাইরে থেকে নির্বাচনের সময়ে ডিউটি করতে আসবেন। তাঁদের গ্যাস দিতে গিয়ে বাংলার লোকের যাতে গ্যাসের সমস্যা না হয়!’’ রাজ্যে কেরোসিনের জোগান বাড়ানো হয়েছে বলে জানান মমতা। তিনি বলেন, ‘‘কেরোসিন আমরা (বরাদ্দ) বাড়িয়েছি কিছুটা। লোকজন কেরোসিন রেশনের মাধ্যমে পাবেন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এখন গ্যাসে রান্না করেন।’’

    পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমাতে দেশে কত তেল এবং এলপিজি মজুত রয়েছে, তা জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশে রান্নার গ্যাস (এলপিজি)-এর জোগান অব্যাহত রাখতে ঘরোয়া উৎপাদন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। দেশে প্রতি দিন ৮০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি-র প্রয়োজন হয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে গ্যাস আমদানির পরিমাণ কমলেও কোনও সঙ্কট তৈরি হবে না বলে আশ্বস্ত করাহয়েছে। তার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, রাজ্যে যে গ্যাস উৎপাদন হয়, তা ভিন্‌রাজ্যে পাঠানো চলবে না।

    কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রল-ডিজ়েলের অন্তঃশুল্ক হ্রাস করেছে। তা নিয়েও মমতা কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আগে তো কমুক। বাড়িয়েছে কত? শাড়ির দোকানের মতো। এটা অনেকটা ১,০০০ টাকা দাম বাড়িয়ে শাড়িতে ৪০০ টাকা ছাড় দেওয়ার মতো। শুল্ক কমানো মানে কত দাম কমবে? শুল্ক কত শতাংশ? আমি চাই, লোকে পাক। লোকের অসুবিধা যাতে না হয়।’’ যদিও কেন্দ্র কেন অন্তঃশুল্ক কমিয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী শুক্রবার জানান, মোদী সরকারের সামনে দু’টি পথ খোলা ছিল। প্রথমত, অন্য দেশের মতো পেট্রল, ডিজ়েলের দাম বাড়িয়ে ভারতীয় তৈল সংস্থাগুলির ক্ষতিপূরণ করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের আর্থিক চাপ মেনে নিয়ে দেশবাসীদের সুরক্ষিত করা। বিবেচনা করে দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানান হরদীপ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারতীয় সংস্থাগুলির বিপুল ক্ষতি লাঘব করতে এই পদক্ষেপ সরকারের।

    বৃহস্পতিবার ঝড়বৃষ্টির কারণে কলকাতা বিমানবন্দরে মুখ্যমন্ত্রীর বিমান অবতরণের সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঝড়বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ে বিমানটি বিমানবন্দরে নামতে পারে নি। প্রায় দেড় ঘণ্টা বিমানটি আকাশে চক্করকাটে। মাঝ-আকাশে আটকে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। বিকেল ৫টা ১৯ মিনিটে বিমানটি নির্বিঘ্নে কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। শুক্রবার ওই বিমানের পাইলটের প্রশংসা করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘পাইলট খুব ভাল ছিল। সব চেষ্টা করেছে। আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে।’’ শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রীর কোনও জনসভা বা অন্য কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। শনিবার তাঁর তিনটি জনসভা রয়েছে। সূত্রের খবর ছিল, শুক্রবার হয়তো তিনি সড়কপথে দুর্গাপুর রওনা হতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমানে চেপেই দমদম বিমানবন্দরে রওনা হন।

    বিমানে চাপার আগে এসআইআর নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারকে একহাত নেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল অতিরিক্ত ভোটার তালিকা বার করতে। প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা আসে নি এখনও। এর থেকে বেশিগণতন্ত্রের হত্যা হতে পারে না! দুর্ভাগ্যজনক।’’ তার পরে তিনি আরও বলেন, ‘‘এত দিন শুনানিহল। শুনেছি ৫০ শতাংশ নাম কেটে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেখে দেখে বাদ দেওয়া হয়েছে। সুতির একটা বুথে ৪০০ নাম বাদ। সেখানে ভোটারই ৫০০। বসিরহাটে একটা বুথে ৬০০ ভোটার। ৪০০ বাদ।’’

    এর পরেই মমতা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, ‘‘এ সব কে করেছে, কারা করেছে? এক দিন না একদিন মানুষ কৈফিয়ত চাইবে। বুকের পাটা থাকলে বলব তালিকা বার করুন। মানুষকে জানতে দিন, কার নাম আছে, কার নেই।’’ মমতা আরও বলেন, ‘‘নাম তোলার ব্যবস্থা করুন ট্রাইবুনাল করে জেলায় জেলায়। গণতন্ত্র ভ্যানিশ করছে। মানুষের অধিকার ভ্যানিশ করছে। এদের দেখে ঘৃণাহয়। লক্ষ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কার জমিদারি? বিজেপির জমিদারি দেশটা? ভ্যানিশকুমারের নামে ওয়াশিং মেশিন চালাবে। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, আজ রামনবমীতে বলে গেলাম।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)