• রাজ্য জুড়ে ঝড়বৃষ্টি! দুর্যোগের মধ্যে কলকাতার আকাশে চক্কর কাটল অমিত শাহের বিমানও, অবশেষে বিমানবন্দরে অবতরণ
    আনন্দবাজার | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • কলকাতায় দুর্যোগের কারণে অবতরণে বাধা পেল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিমানও। রাত ১১টা ৪০ মিনিট নাগাদ তাঁর বিমান অবতরণের কথা ছিল কলকাতা বিমানবন্দরে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। শাহের বিমান কলকাতার আকাশে চলে এসেছিল ১২টা ২৫ মিনিট নাগাদ। প্রায় ৫৫ বিমানটি আকাশে চক্কর কেটেছে। এক বার কৃষ্ণনগরের দিক থেকেও তা ঘুরে এসেছে বলে সূত্রের খবর। রাত ১টা ২০ মিনিট নাগাদ শাহের বিমান অবতরণ করে কলকাতায়। এর আগে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন।

    সাধারণত বিএসএফের বিমানে যাতায়াত করেন শাহ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে শুক্রবার তিনি সেই বিমানে আসেননি। এসেছেন ছোট আকারের একটি বেসরকারি বিমানে। সেই কারণেই দুর্যোগে তা অবতরণ করাতে সমস্যায় পড়েছিলেন পাইলটেরা। শাহের সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা ছিলেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে কলকাতা বিমানবন্দরে দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারেরা। ছিলেন অমিত মালবীয়।

    দিনভর গুমোট গরমের পর রাতেই ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছে কলকাতা ও শহরতলিতে। সঙ্গে রয়েছে অনবরত মেঘের গর্জন। ঝড়ও উঠেছে। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দুর্যোগের কারণে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন। আলিপুর আবহাওয়া দফতর রাতে ছয় জেলায় লাল সতর্কতা জারি করেছে। সেই তালিকায় কলকাতাও রয়েছে।

    বৃহস্পতিবার পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূমে কর্মসূচি সেরে কলকাতায় ফিরতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিমানও ঝড়বৃষ্টির মুখে পড়ে। ওই বিমানটিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আকাশে চক্কর কাটতে হয়েছিল। কলকাতা বিমানবন্দর এলাকায় প্রবল ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর তিনি কলকাতায় নামেন। শুক্রবার সংশ্লিষ্ট পাইলটদের প্রশংসাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

    লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে। রাত সাড়ে ১১টার বুলেটিনে হাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই জেলাগুলিতে আগামী দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রবল ঝড়বৃষ্টি এবং বজ্রপাত হতে পারে। কলকাতা ও দুই ২৪ পরগনায় ঝড়ের বেগ থাকবে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। তবে বাকি তিন জেলায় তা ৮০ কিলোমিটারেও পৌঁছে যেতে পারে।

    শুক্রবার রাতে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হয়েছে বেহালা, গড়িয়া, বরানগর, যাদবপুর, কালিকাপুর, নিউ টাউন, কালিন্দিতে। ডানকুনি, শ্যামনগরের মতো এলাকায় ঝড়বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ পরিষেবা বিঘ্নিত। ডানলপ, সিঁথির মতো এলাকায় বজ্রপাতের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দও শোনা গিয়েছে। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর সামনে উত্তম কুমার সরণিতে একটি গাড়ির উপরে গাছ পড়ে যায়। শুক্র বার রাতে গল্ফগ্রিনেও গাছ পড়ার ঘটনা ঘটেছে। ঝড়বৃষ্টির জেরে এন্টালিতে একটি পাঁচিল ভেঙে গিয়েছে।

    ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, উত্তর দিনাজপুর, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, কালিম্পঙেও সতর্কতা জারি করেছে হাওয়া অফিস। রাতেই ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এই সমস্ত জেলায়। এখানে জারি রয়েছে কমলা সতর্কতা।

    পশ্চিম মেদিনীপুরের গুড়গুড়িপাল থানা এলাকায় শুক্রবার রাতের ঝড়বৃষ্টির জেরে গাছের ডাল পড়ে মৃত্যু হয় এক কনস্টেবলের। আহত তিন জন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতের নাম সন্তোষ ছেত্রী (৫৯)। বাড়ি মেদিনীপুর শহরের নেপালিপাড়া এলাকায়। থানা সূত্রে খবর, গুড়গুড়িপাল থানা এলাকার জঙ্গল লাগোয়া অঞ্চলে একটি গাছের ডাল ভেঙে পড়ে পুলিশের গাড়ির উপরে। এই ঘটনায় গাড়িতে থাকা পুলিশ কর্মীরা আহত হন। চার জনকে উদ্ধার করে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে সন্তোষের দেহ পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা জানান তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাকি তিন আহত পুলিশকর্মীর মধ্যে এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁকে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছোন জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) সৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে, মেদিনীপুর শহরে ঝড় থামার পরে রাস্তার অবস্থা দেখতে বেরিয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজয় হাজরা। শুক্রবার মেদিনীপুর শহর ও শহর সংলগ্ন বেশ কিছু জায়গায় গাছের ডাল থেকে শুরু করে প্যান্ডেল ও তোরণ ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটে।

    গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং সংলগ্ন বাংলাদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তার উচ্চতা ০.৯ কিলোমিটার। এ ছাড়া, উত্তর-পশ্চিম বিহার থেকে মণিপুর পর্যন্ত একটি অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে। তা ঘূর্ণাবর্তের উপর দিয়ে গিয়েছে। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ঢুকছে স্থলভাগে। তাই বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

    সমুদ্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, সমুদ্রের উপর মাঝেমধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তার গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর ওড়িশার উপকূলে শনিবার তার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওই দিন মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আবহবিদেরা।

    দক্ষিণবঙ্গে শিলাবৃষ্টির সতর্কতাও জারি করা হয়েছে। শনিবার শিলাবৃষ্টি হতে পারে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া এবং হুগলির কোনও কোনও জায়গায়। রবিবার থেকে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি কিছুটা কমবে। আগামী মঙ্গলবার ফের সব জেলাতেই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।

    রাতে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়িতেও লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রবিবার পর্যন্ত উত্তরের জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টি চলবে। ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে। এই জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়াও বইবে। সঙ্গে হতে পারে শিলাবৃষ্টি।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)