• এসআইআরে কোপ পড়েছে মহিলা ভোটে
    আনন্দবাজার | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • মহিলা ভোটে ধস! সৌজন্যে এসআইআর!

    ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর জেরে মহিলা ভোটারদের নাম বহুলাংশে বাদ যাচ্ছে বলে লাগাতার সরব রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আগে অভিযোগ করেছেন। শুক্রবার সংসদে তৃণমূলের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় সরকার নিজে নির্বাচন কমিশনের নথি বিশ্লেষণ করে যে তথ্য পেশ করল, তাতেও মহিলা ভোটারদের উপরে বড় রকম কোপ পড়েছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে।

    কেন্দ্রীয় মন্ত্রকই জানাচ্ছে, এসআইআর-এর পরে এ রাজ্যে নথিভুক্ত মহিলা ভোটারের সংখ্যা গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছে। মহিলা ভোটারের সংখ্যা কমেছে প্রায় আট লক্ষ। একই সঙ্গে গত ১৩ বছরে এই প্রথম বার ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষ অনুপাতও কমেছে। এই হিসাব ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে। এর পরেও লক্ষ লক্ষ ভোটার এখনও ‘বিবেচনাধীন’। নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে নাম কাটা যাওয়ার চূড়ান্ত হিসাব কোথায় দাঁড়াবে, সেটা স্পষ্ট নয়।

    রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের কাছে মহিলা ভোট একটা বড় ভরসার জায়গা। সেখানে কোপ পড়ায় তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। মুখ্যমন্ত্রী নিজে অভিযোগ তুলেছেন, ‘‘বিজেপি হিংসুটে বলে মহিলাদের নাম বাদ দিচ্ছে।’’ মহিলাদের নিশানা করা হয়েছে বলে দাবি সিপিএমেরও। অন্য দিকে তাদের গায়ে যাতে ‘নারীবিরোধী’ তকমা না লাগে, সেটা বিজেপিরও মাথাব্যথা। মহিলা ভোটকে তারাও গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সুতরাং বিজেপির পাল্টা দাবি, প্রশাসনের অপদার্থতার কারণেই মহিলাদের নাম ব্যাপক ভাবে বাদ গিয়েছে।

    শুক্রবার লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নের উত্তরে লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার মন্ত্রক নির্বাচন কমিশনের নথির ভিত্তিতেই ভোটারদের খতিয়ান পেশ করেছে। সেখানেই দেখা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত মোট সংখ্যা এবং আনুপাতিক হার, দু’দিক থেকেই মহিলাদের হার কমেছে। অর্থাৎ এসআইআর-এর পরে বাংলার মহিলা ভোটারদের একটা অংশ ‘লাপতা লেডিজ়’ বা বেপাত্তা নারীতে পরিণত হয়েছেন।

    মন্ত্রক জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি ১০০০ পুরুষ ভোটারের বিপরীতে মহিলা ভোটারের সংখ্যা (লিঙ্গ অনুপাত) ২০২৫ সালে ভোটার তালিকার স্পেশাল সামারি রিভিশনে (এসএসআর) ছিল ৯৬৯। এসআইআর-এর পরে সেটা এখনই ৯৬৪-তে নেমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। এর আগে এই অনুপাত ২০২১ সালে ছিল ৯৬১। সেটা থেকে বেড়ে ওই অনুপাত ২০২২ সালে ৯৬৫, ২০২৩ সালে ৯৬৭ এবং ২০২৪ সালে ৯৬৮ হয়েছিল। এখন সেটা ৯৬৯ থেকে এক ঝটকায় ৯৬৪ হয়ে গিয়েছে।

    কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল এ দিন লোকসভায় জানান, পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের মোট সংখ্যাও কমে গিয়েছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২৪ লক্ষ। আর এসআইআর-এর পর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তালিকা মোতাবেক তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ। মৃত-বেপাত্তা-স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম এখানে বাদ গিয়েছে। কিন্তু ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় এমন অনেকেই রয়েছেন, বিয়ের পরে পদবি বদলের কারণে যাঁদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টে করা মামলায় মোস্তারি বানু এই সমস্যার কথাই বলেছেন। বিয়ের পরে পদবি বদল, ঠিকানা বদলকে কেন্দ্র করে মহিলাদের হয়রানি বাড়ছে বলে বারবার অভিযোগ উঠছে। মুখ্যমন্ত্রীও সে কথা বলছেন বার বার।

    নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই যেমন ময়নাগুড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘বিয়ের পরে মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছে, পদবি বদলেছে। তাতে সব বাদ!’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, ‘‘গরিব প্রান্তিক অংশের মানুষ, সংখ্যালঘু, মতুয়া ও আদিবাসী এবং মহিলাদের নিশানা করে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বাংলার মানুষ ভোট কাকে দেবেন, পরের কথা। তবে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁরা ভোটাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকবেন? না কি যারা ভোটাধিকার লুট করতে চাইছে, তাঁদের পক্ষে।’’

    বিজেপি অবশ্য দাবি করছে, আলাদা করে মহিলাদের নিশানা করা হয়নি মোটেই। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অগ্নিমিত্রা পালের কথায়, ‘‘পুরুষ-মহিলা বিভাজন করে তো এসআইআর হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অপদার্থ আধিকারিকরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন বলেই মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এবং কাকতালীয় ভাবে সেখানে মহিলাদের সংখ্যাটা বেশি। যাঁদের উপযুক্ত নথি নেই, আইন মেনে কী ভাবে তাঁদের নাম রেখে দেওয়া সম্ভব?’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)