• গুলি চলছে হামেশাই, হিংসামুক্ত ভোট হবে কী ভাবে?
    আনন্দবাজার | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বোমা-গুলির দৌরাত্ম্য থামছে না শহরে! কখনও মদের আসরে গুলি চালানোর ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে যুবকের। কখনওআবার পাড়ার গন্ডগোলকে কেন্দ্রকরে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন তরুণ। শহরে পর পর এমন গুলি চালানোর ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, বিধানসভা নির্বাচনের মুখে শহরে এত বেআইনি অস্ত্র আসছে কী ভাবে?

    বুধবার মধ্যরাতে পাটুলি থানা এলাকার বাঘা যতীনের পূর্ব ফুলবাগানে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। একটি আবাসনের ছাদে বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান করছিলেন রাহুল দে নামে এক যুবক। সেই সময়ে চার জন সেখানে ঢুকে রাহুলকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় বলে অভিযোগ। রাহুল গুলিবিদ্ধ হন। আহত হন জিৎ নামে আরও এক যুবক। সঙ্কটজনক অবস্থায় তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা রাহুলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পাটুলির এই ঘটনার ঠিক এক মাস আগে তিলজলা রোডে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন মহম্মদ নিয়াজ ওরফে রাজা নামে এক তরুণ। বেনিয়াপুকুর থানা এলাকার সেই ঘটনায় কয়েক জন স্থানীয় যুবকের সঙ্গে ওই তরুণের বচসা হয়েছিল। সেই আক্রোশেই রাতে রাজাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। তদন্তে নেমে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। উদ্ধার করা হয়েছিল বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র। তারও আগে রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার গোলপার্কে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে বোমাবাজি হয় এবং গুলি চলে বলে অভিযোগ করেছিলেন বাসিন্দারা। বেশ কয়েক জন আহত হয়েছিলেন সেই ঘটনায়।

    রাজ্যে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়েছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। যদিও হিংসামুক্ত নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনের তরফে প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে থেকে। কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশ এলাকায় যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের নামের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। দুষ্কৃতীদের গ্রেফতারে জোর দেওয়ার পাশাপাশি বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারেও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে। লালবাজারের শীর্ষ কর্তারাও একাধিক বার হিংসামুক্ত নির্বাচন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। যদিও শহরে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পর পর গুলি চালানোর ঘটনা পুলিশের সেই আশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

    প্রশ্ন উঠেছে, যে শহরে এত বোমা-গুলি মজুত রয়েছে এবং ঘন ঘন সেগুলি ব্যবহারও করা হচ্ছে, সেই শহরে কি আদৌ হিংসামুক্ত ভোটগ্রহণ সম্ভব? অস্ত্র নিয়ে দুষ্কৃতীরা যাতায়াত করলেও কেন নাকা তল্লাশি বা পুলিশি নজরদারিতে সেগুলি ধরা পড়ছে না, সে প্রশ্নও উঠেছে। প্রাক্তন পুলিশকর্তা অজয় মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘আগে বিহার-ঝাড়খণ্ড থেকে শহরে অস্ত্র ঢুকত। এখন এ রাজ্যে, শহরতলিতেই বেআইনি অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। বেআইনি অস্ত্রের দাপট বন্ধ করতে পুলিশকে বিশেষ পরিকল্পনাকরতে হবে এবং সারা বছর ধরে নজরদারি চালাতে হবে। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে উদ্যোগী হলে এ সব আটকানো যায় না। শহরে এ ভাবে অস্ত্র পাওয়া গেলে বলতেই হবে, পুলিশের পরিকল্পনাতেই খামতি রয়ে যাচ্ছে।’’

    বেআইনি অস্ত্রের রমরমা শুধু নয়, একাধিক ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গিয়েছে, পাটুলির ঘটনায় নিহত যুবক রাহুলের বিরুদ্ধেও একাধিক দুষ্কর্মের অভিযোগ ছিল। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে রাহুল পুলিশের নাগালের বাইরেই ছিলেন। একই ভাবে এখনও অধরারবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার কাঁকুলিয়া রোডের গুলি-কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত সোনা পাপ্পুও। সুতরাং, দাগি অপরাধীরা জেলের বাইরে থাকলে অবাধ এবং হিংসামুক্ত নির্বাচন কী ভাবে হবে, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। লালবাজারের কর্তারা যদিও আশ্বাস দিচ্ছেন। এক কর্তার কথায়, ‘‘পাটুলিতে গুলি চালানোর ঘটনার সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক নেই। নির্বাচন হিংসামুক্ত রাখতে একাধিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী শহরে রয়েছে। হিংসা রুখতে প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)