এ চিঠি কোনও আইন বিশেষজ্ঞ বা সমাজকর্মী হিসেবে লিখছেন না ওঁরা। সাম্প্রতিক রূপান্তরকামী সংশোধনী বিলের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী সন্তানের মা, বাবা হিসেবে দেশের সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার ও তাঁর স্ত্রী কমলকে আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা। ২০১৪-এর নালসা রায় অগ্রাহ্য করে নতুন বিল তাঁদের সন্তানদের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে বলে সরব এই মা-বাবারা।
‘স্বীকার’ নামের ওই অভিভাবক মঞ্চের তরফে ট্রান্স সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকেও চিঠি লেখা হয়েছে। সদ্য পাশ হওয়া নতুন বিলটি রূপান্তরকামীদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার পুরোপুরি ডাক্তারি বোর্ডের উপরে ফেলে দিচ্ছে। স্বীকার-এর তরফে মহুয়া শেঠ বলছেন, “রূপান্তরকামী বা ছক ভাঙা লিঙ্গ পরিচয়ের সন্তানদের মা-বাবারা অনেকেই অসম্ভব ভয়ে, মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছেন। সন্তানদের আত্ম পরিচয়ের সঙ্কটে রাজ্যের প্রান্তিক এলাকা থেকেও অনেকে যোগাযোগ করে কান্নাকাটি করছেন।”
নতুন বিলে শরীরগত কোনও ভিন্নতা না থাকলে কাউকে এক জন রূপান্তরকামী হিসেবে মেনে নিতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া হিজড়া, কিন্নর, আরাবল্লি, যোগাপ্পাদের মতো কয়েকটি পরম্পরাগত গোষ্ঠীকেই শুধু রূপান্তরকামী বলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু রূপান্তরকামীদের মধ্যে অনেকেই নিজেকে ভুল শরীরে বন্দি ভাবেন। যদিও নানা জটিলতায় সব সময়ে তাঁরা অস্ত্রোপচার করতে পারেন না। সে কথা বুঝিয়ে মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিটিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা সন্তানের হৃদয় জানি, মন বুঝি। সন্তানের পরিচয় স্বীকার করতে তাকে শল্য চিকিৎসকের ছুরির নীচে রক্তাক্ত করার কারণ থাকতে পারে না।’
কলকাতার নীলাঞ্জন মজুমদারের সন্তান নিজেকে ট্রান্সম্যাস্কুলিন বা রূপান্তরকামী পুরুষ বলতে স্বচ্ছন্দ। তিনি মুম্বইয়ের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন। লিঙ্গ নিরপেক্ষ ছাত্রাবাসে থাকেন। নীলাঞ্জন চিন্তিত, “এ দেশে বহু কষ্টে অর্জিত ট্রান্স মানুষদের জন্য পাওয়া ছিটেফোঁটা অধিকারই তো বিপন্ন হতে বসল।” রূপান্তরকামী কন্যার পিতা কৌস্তুভ মুখোপাধ্যায় বা আর এক জন ট্রান্সফেমিনিন সন্তানের মা ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীও নিজেদের সন্তানের সঙ্কটে ব্যথিত।
ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অপরাধমুক্ত করার আন্দোলনের সময়েও সর্বোচ্চ আদালতে চিঠি লিখেছিলেন সমপ্রেমী ছেলেদের মা-বাবারা। অন্যায় আইন রুখতে অনেকে হলফনামাও পেশ করে বলেন, তাঁদের ছেলেরা অপরাধী নন। এ বার অভিভাবকেরা চিঠিতে বলছেন, বৈচিত্র্যপূর্ণ লিঙ্গ পরিচয়ের সন্তানের মা-বাবা হওয়া বোঝা নয়। সন্তানের নাগরিক ও মানবিক অধিকারের লড়াইয়ে পাশে থাকাটা তাঁদেরও দায়। রূপান্তরকামীরা এখনও বেশির ভাগই বাড়িতেও নির্যাতনের শিকার। সামাজিক প্রতিকূলতায় রূপান্তরকামী শংসাপত্র নিতেও ভয় পান।
স্বীকার-এর তরফে মা-বাবার চিঠিটি তাই উলটপুরাণও। নতুন বিলে রূপান্তরকামী সন্তানদের সুহৃদ্দেরও আইনি সাজা দেওয়ার কথা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের কমিটি ইতিমধ্যে নতুন বিলটি নালসা রায়ের অবমাননা বলে সংসদকে সতর্ক করেছে। সামাজিক ন্যায়ের অধিকার কর্মীদের অনেকেরই এক সুর, রূপান্তরকামীদের নিয়ে এই বিলও বোঝাচ্ছে, সংখ্যার জোরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক, অসহায় গোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণটাই ক্রমশ এ দেশের রীতি হয়ে উঠছে।