তে-রাস্তার মোড়ে বিশাল তেতলা বাড়ি। নীচের দোকানে সাজানো বাজির পসরা — কী নেই সেখানে! কিন্তু বাড়ির পিছনে রয়েছে কালো ত্রিপলে ঘেরা একটি ছোট্ট ঝুপড়ি। উঁকিঝুঁকি না দিলে তা চট করে চোখেও পড়ে না। সামনের বাড়ির পিছনে কার্যত লুকোনো অস্থায়ী কাঠামোটি বড়ই বেমানান। সরু গলি ধরে সেখানে যেতে গেলেই বাধা এল। এক জন থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় সতর্কবার্তা দিলেন — “ও দিকে যাবেন না। বাজি যা লাগবে, এখানেই পাবেন।”
প্রায় তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের অগস্টে ন’টি প্রাণের বিনিময়ে বন্ধ হয়েছিল দত্তপুকুর থানার মোচপোলের বেআইনি বাজি কারবার। সেই ঘটনার পরে প্রশাসনিক কড়াকড়ির আশ্বাস মিলেছিল। কিন্তু বাস্তব বলছে, সেই ‘শিক্ষা’ স্থায়ী হয়নি। মোচপোল থেকে মাত্র দু’কিলোমিটার দূরের নারায়ণপুরে অবাধে চলছে বেআইনি বাজির কারবার। সবুজ বাজির আড়ালে রমরমিয়ে চলছে বেআইনি বাজি তৈরি ও বিক্রির কারবার। দোকানে ঢুকে প্রশ্ন করলেই সামনে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ বাজির সম্ভার। থানা-পুলিশের ভয়? তা কার্যত নেই বললেই চলে। ব্যবসায়ীদের নির্ভীক মন্তব্য— “পুলিশের গাড়ি গলিতে ঢোকার আগেই খবর হয়ে যাবে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বেআইনি বাজি কারখানায় নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে পুলিশের বিশেষ নির্বাচনী সেল। কোথায়, কী ধরনের বেআইনি কারবার চলছে, তল্লাশি হয়েছে কিনা, কত বাজি বাজেয়াপ্ত হয়েছে— সব কিছুর রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্দেশ কাগজেকলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নারায়ণপুরের ‘বাজি-হাব’ রয়েছে পুরনো ছন্দেই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকান খুলে প্রকাশ্যেই চলছে বারুদের ব্যবসা।
মোচপোলে বিস্ফোরণের পরের কয়েক মাস নারায়ণপুরে ব্যবসা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশি তৎপরতা কমতেই বেআইনি কারবার ফের পুরো দমে শুরু হয়েছে। কেউ সবুজ বাজির লাইসেন্সকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে সেই নিয়ম মানার প্রয়োজনও বোধ করছেন না। আগের মতোই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত করে তৈরি হচ্ছে বাজি।
এমনকি, পুলিশের নজর এড়াতে বদলেছে কৌশলও। আগে ছোট লরিতে মশলা আনা হত, এখন সেই লরিকে কন্টেনারের মতো ঢেকে আনা হচ্ছে। টিনের ড্রামে ভর্তি ‘মশলা’ ঢুকছে এলাকায় — প্রায় প্রকাশ্যেই। অর্থনৈতিক চাপে এলাকার বহু বাসিন্দা এই বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে প্রতিবাদ কার্যত স্তব্ধ।
তবু ব্যতিক্রম আছে। স্থানীয় নবম শ্রেণির ছাত্র মোস্তাফা মণ্ডল জানাল, তার বাড়িতে বাজি তৈরি করতে চাইলে সে প্রতিবাদ করেছিল। তার কথায়, “এখানে প্রায় সব বাড়িতেই বাজি তৈরি হয়। কিন্তু থানা-পুলিশের ভয় সব সময়ে আমাদের তাড়া করুক, তা আমি চাইনি।”
ওই কিশোর প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর একা। নারায়ণপুর জুড়ে তার কোনও প্রতিধ্বনি নেই। উল্টে বাড়ির পিছনে, বাগানের আড়ালে ত্রিপল টাঙিয়ে চলছে বাজি তৈরির কাজ, যে কোনও সময়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই। এমনকি, বাজির আড়ালে বিস্ফোরক তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীদের একাংশ।
নারায়ণপুর মোড়েই ব্যবসায়ী আরিফুল আলির পরিবারের দাবি, মোচপোলের ঘটনার পরে তাঁরা লাইসেন্স নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী সোনামণির স্বীকারোক্তি অনেকটাই স্পষ্ট — “এই ব্যবসা পুরো নিয়ম মেনে করা যায় না। একটু এ দিক-ও দিক হয়। সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না।”
নির্বাচনের আগে এলাকায় পুলিশের আনাগোনা বেড়েছে— কখনও সাদা পোশাকে, কখনও রাতের অন্ধকারে। তবুও নারায়ণপুর এখনও ‘বারুদের বিষ’ থেকে মুক্ত নয়। জেলা পুলিশের দাবি, তল্লাশি চলছে, বেআইনি বাজি ধরতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—মোচপোলের মতো ঘটনার পরেও যদি একই চিত্র ফিরে আসে, তবে এই নজরদারি কতটা কার্যকর? প্রশাসনের এই ঢিলেঢালা অবস্থান কি আরও একটি বিপর্যয়ের জমি তৈরি করছে?