‘কেন ছিল না নিরাপত্তা ব্যবস্থা? শুটিংয়ের মধ্যেই কী ভাবে এমন পরিণতি?’ রাহুলের মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে সরব অনেকে
আনন্দবাজার | ৩০ মার্চ ২০২৬
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে স্তব্ধ টলিপাড়া। খবর ছড়ানোর পরেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অনেকে। তবে ঘটনার আকস্মিকতা কাটতেই একে একে প্রশ্ন তুলছেন টলিপাড়ার অভিনেতা-পরিচালকেরা। ঠিক কী ঘটেছিল? তা এখনও স্পষ্ট নয়। নানা রকমের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে সংশ্লিষ্ট ধারাবাহিকটির প্রযোজনা সংস্থা ও আর্টিস্ট ফোরাম।
রবিবার ঘটনার পরেই প্রথমে শোনা গিয়েছিল, শুটিং প্যাকআপ হওয়ার পরে সমুদ্রে তলিয়ে যান রাহুল। এমন খবরও ছড়ায়, নৌকো থেকে সমুদ্রে পড়ে যান অভিনেতা। তবে স্থানীয় সূত্রে আগেই জানা যাচ্ছিল, শুটিং চলাকালীনই ঘটনাটি ঘটে। জলের মধ্যে রাহুল ও শ্বেতা হাত ধরে এগিয়ে যাবেন, এমনই ছিল দৃশ্যটি। শুটিংয়ে উপস্থিত জনাকয়েক সদস্য জানিয়েছেন, রাহুল ও শ্বেতা নাকি জলে অনেকটা এগিয়ে যান। পায়ে শাড়ি আটকে যাওয়ায় শ্বেতা নাকি পড়ে যান। বড় ঢেউ আসায় রাহুলও পড়ে যান। শ্বেতাকে উদ্ধার করা গেলেও রাহুল তলিয়ে যান। রাহুলকে স্পিড বোট উদ্ধার করার পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এমনই নানা বিবরণ উঠে আসছে।
আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন টলিপাড়ারই অনেকে। তাঁরা তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছেন। অনেকেই আঙুল তুললেন আর্টিস্ট ফোরামের দিকে। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “বিভিন্ন সূত্র থেকে বিভিন্ন রকমের খবর পাচ্ছি। এই অসঙ্গতিগুলো দূর হোক এবং নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত হোক। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
অভিনেতা জীতু কমল নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে এনে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। শুটিংয়ে গিয়ে এক বার এমনই নিরাপত্তা গাফিলতিতে তাঁরও মৃত্যু হতে পারত বলে অভিযোগ। সে বার আর্টিস্ট ফোরামের কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সদুত্তর পাননি বলে জানান তিনি। জীতুর কথায়, “একটি প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। আমার যদি সেই সময়ে মৃত্যু হত, তখন আর্টিস্ট ফোরাম বলত, ‘তদন্ত হোক?’ ধুলোবালির মধ্যে আমি কাজ করতে পারছিলাম না। বার বার বলেছিলাম সেটা। আর্টিস্ট ফোরামকে জানানোর পরেও তারা চুপ ছিল। আর্টিস্ট ফোরামের উপর আমার ভরসা কম। তদন্তের দরকার পড়লে নিজেদেরই যা করার করতে হবে। ফোরাম কিছু করবে না।”
অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী সমাজমাধ্যমে স্পষ্ট বিবৃতিতে তদন্তের দাবি করেছেন। আর্টিস্ট ফোরাম এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ করছে, তা-ও জানতে চেয়েছেন তিনি।
বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র-সহ টলিপাড়ার আরও কয়েক জন অভিনেতা-অভিনেত্রী। শুটিংয়ের মাঝে, না কি প্যাকআপের পরে এই ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করেছেন শ্রীলেখা। শুটিং চলাকালীন লোকেশনে বহু লোকজন থাকেন। তার মধ্যে কী ভাবে রাহুল জলে তলিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে এমনও শোনা গিয়েছে, সমুদ্রে শুটিংয়ের অনুমতি ছিল না। ওড়িশা পুলিশেরও এমন দাবি বলে শোনা যাচ্ছে। অনুমতি ছাড়া কী ভাবে সমুদ্রে শুটিং হল, সেই প্রশ্নও তুলছেন টলিপাড়ার একাধিক অভিনেতা। পরিচালক পারমিতা মুন্সী প্রশ্ন তুলেছেন, এক জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জলে ডুবে মারা যেতে আনুমানিক ৫-৬ মিনিট লাগে। সেই সময় কি ইউনিটের কেউ ছিলেন না ওখানে? সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে শুটিং করতে গিয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। দেবলীনা দত্ত, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, চৈতি ঘোষাল-সহ আরও অনেকেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, তমলুকের হাসপাতালে সোমবার রাহুলের ময়নাতদন্ত হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। তাঁর ফুসফুসের ভিতরে অস্বাভাবিক পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে বালি এবং নোনা জল। তাঁর খাদ্যনালি, শ্বাসনালি, পাকস্থলীর ভিতরেও বালি ঢুকে গিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে রিপোর্টে। অভিনেতা জলের তলায় অন্তত ঘণ্টাখানেক ডুবেছিলেন বলে খবর।
এখানেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, অভিনেতা জলের তলায় পড়ে রইলেন, অথচ তাঁকে উদ্ধার করতে এতটা সময় লেগে গেল? ইউনিটের বাকি লোকজন কী করছিলেন? এ সব নানা প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায় টলিউডের কলাকুশলীদের একটা বড় অংশ।