• ‘মেয়ের জায়গায় বালিশ রেখে দিই’, সন্তান হারালেও ভোট ময়দানে কর্মে বদ্ধপরিকর তামান্নার মা
    প্রতিদিন | ০৮ এপ্রিল ২০২৬
  • কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন (Sabina Yasmin)। কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন রাজনৈতিক অশান্তির জেরে প্রাণ হারিয়েছিল বছর বারোর তামান্না। মেয়ের মৃত্যুর ন্যায়বিচারের লড়াই-ই কি এক মায়ের কাছে হয়ে উঠেছে রাজ্যবাসীর অধিকারের লড়াই? সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই তামান্নার মা।

    প্রশ্ন: নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন দলের প্রার্থী নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আপনি জয়ী হলে এলাকার মানুষের জন্য কী কী করার অঙ্গীকার করছেন?

    উত্তর: আমি কোনও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেব না। যা নিজের চোখে দেখছি, সেটুকু নিয়েই বলব। আমার তামান্না তো আর ফিরবে না, এখন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। কালীগঞ্জ অঞ্চলের বেশিরভাগ স্কুল আজ বন্ধ হওয়ার মুখে। আমি জয়ী হলে সেগুলো সচল রাখা ও পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দেব। এছাড়া, এলাকার বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় খুলে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। বল্লভপাড়া ঘাটে কিছুদিন আগে দুর্ঘটনায় মারা গেল এক ১৫ বছরের কিশোর। সেখানে গিয়ে শুনলাম, প্রতি মাসেই এমন মৃত্যু লেগে থাকে। ওখানে একটা ওভারব্রিজ তৈরি করতে চাই। এগুলো সরকারের দেখার কথা। কিন্তু দেখে না। ঘাট ব্যবহার থেকে যে মুনাফা আসে, তা ঠিকই সংগ্রহ করে নেয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই। আমি জয়ী হলে অন্তত স্পিডবোট বা লাইভ জ্যাকেটের মতো জরুরি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করব।
    নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে যখন অন্য শিশুদের দেখি, আদর করি, মনে হয় নিজের মেয়েকেই দেখছি। তাদের বুকে জড়িয়ে শান্তি অনুভব করি। এভাবে যে তামান্নাকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, তা তো মানুষের সঙ্গে না মিশলে জানতে পারতাম না।

    প্রশ্ন: গত বছরের সেই অভিশপ্ত দিনে আজান শেষে তামান্নাকে স্নান-খাওয়ার কথা বলেছিলেন। পুকুরঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে সে। আর তখনই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। কন্যা হারানোর গভীর শোক চেপে কীভাবে কাটালেন এতগুলো দিন?

    উত্তর: এমন কোনও মুহূর্ত নেই যখন আমি তামান্নার কথা ভাবি না। আমার প্রতি নিঃশ্বাসে ও আছে। মনে হয়, চোখের সামনেই রয়েছে যেন। নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে যখন অন্য শিশুদের দেখি, আদর করি, মনে হয় নিজের মেয়েকেই দেখছি। তাদের বুকে জড়িয়ে শান্তি অনুভব করি। এভাবে যে ওকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, তা তো মানুষের সঙ্গে না মিশলে জানতে পারতাম না। রাতে ঘুমানোর সময় মেয়ের জায়গায় বালিশ রেখে দিই। ঘুমের মধ্যে বলি উঠি, “বাবু এগিয়ে এসো!” ওর আব্বু কখনও বলে, “নেই তামান্না!” কখনও মেনে নেয়। যদি মনে করি যে ও নেই, আমি একা, তখনই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মাথার উপর।

    প্রশ্ন: দেওয়াল জুড়ে ‘সাবিনা ইয়াসমিন’ লেখা থাকলেও, যখনই প্রচারে যাচ্ছেন, মানুষ বলে উঠছে, “তামান্নার মা এসেছে”। আপনি নিজেও বলেছেন যে, নতুন করে হারানোর মতো আর কিছু নেই আপনার। সে কারণেই নেতৃত্বের কাছেও বলেছেন যে সমাজের জন্য কাজ করতে চান।

    উত্তর: মীনাক্ষীদি, সেলিমদা বা বিমানবাবু যখন দেখা করতে এসেছেন, আমি ওঁদের জানিয়েছি যে আমি ওঁদের সঙ্গেই থাকতে চাই। কাজের মধ্যে থাকতে চাই। মীনাক্ষীদি এত বড়মাপের মানুষ, অথচ কী অদ্ভুতভাবে আপন করে নিয়েছেন আমাকে। আমি ওঁকে বলি, তুমি কি আমার ছোট বোন? দূরে থাকলে ‘আপনি’ বলি। কিন্তু কাছে এলে ‘তুমি’ বলে ফেলি। গাল টিপে আদর করি। উপরমহলে যাঁরা আছেন, সকলেই যেন গার্জেন হয়ে গিয়েছেন আমার। এখন ওঁরা যা বলবেন, আমি তাই করব।

    প্রশ্ন: আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে যেদিন বিমান বসু বা মহম্মদ সেলিমরা আপনার নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করলেন, প্রস্তুত ছিলেন, নাকি অবাক হয়েছিলেন?

    উত্তর: আমি তো কোনওদিন রাজনীতি জানতাম না। হঠাৎ করে প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কান্নাকাটিও করেছি। মীনাক্ষীদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ভুল হল না তো?” মীনাক্ষীদি সাহস জুগিয়ে বলেছিল, “তুমি শক্ত থাকো, পরিস্থিতি ঠিক শান্ত হয়ে যাবে। তুমি কান্নাকাটি করছ কেন? তুমি তো শক্ত মা!”

    প্রশ্ন: আপনার নাম ঘোষণার পর যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তার জেরেই কি ভেঙে পড়া?

    উত্তর: না, তার আগেই! মনে হয়েছিল, এত বড় দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা আমার নেই। অখিলেশদাকে (স্থানীয় নেতা) বলেছিলাম, “নিজের চোখে যেটুকু দেখেছি, তার বাদে কিছু জানি না। আমার মেয়ের অপরাধীদের চিনি। ওদের অতীত সম্পর্কে জানি। এটুকুই।” তিনি বলেছিলেন, আমি যা জানি, তাতেই চলবে।

    প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, সেদিনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা কি সত্যিই গ্রেপ্তার হয়নি?

    উত্তর: ১০জন গ্রেপ্তার হয়েছিল তখন। কিন্তু এখনও তাদের ঘুরে বেড়াতে দেখি। পেয়ারার জমিতে, মাঠে, ক্ষেতে ধান কাটছে, আড্ডা দিচ্ছে, ছাতে কবুতর ওড়াচ্ছে। পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ আসে। এমন নয় যে তারা আসে না! কিন্তু দেখা যায়, ততক্ষণে অপরাধীরা সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছে! পুলিশ আসছে, তা ওরা কী করে খবর পায়, ধারণা নেই। সন্দেহের বশে মন্তব্য করা উচিত হবে না।

    প্রশ্ন: আপনার নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকে অভিযুক্তদের আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখেছেন?

    উত্তর: না, ওদের কোনও পরিবর্তন নেই। ভোট এসেছে বলে যে নিজেদের দল নিয়ে খুব মাতামাতি করছে, তাও দেখিনি। তবে ‘তামান্নার মাকে মারধর করব’— এমন হুমকিও কানে আসেনি।

    প্রশ্ন: শিক্ষার অব্যবস্থা, ঘাটের নিরাপত্তা প্রভৃতি যেসব বিষয়ের কথা বললেন এখন, নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে কি তা বলার সুযোগ পাচ্ছেন? নাকি কেবল আপনার মেয়েকে নিয়েই কথা হচ্ছে?

    উত্তর: ঠিক তা নয়। আমি গিয়ে দাঁড়ালে ‘তামান্নার মা’ বলেই আমার পরিচয় দিচ্ছে সবাই। তবে তারপর যার যার মতো করে সমস্যার কথা জানাচ্ছে। কেউ ভয় পাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট না দিলে হয়তো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে যাবে। আমি নিজের মতো করে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। হয়তো নিজে প্রার্থী না হলে আমার মনেও এসব ভয় আসত। কিন্তু তামান্না গিয়ে আমায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এ টাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মোদিজির ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আসে না। আমি আমার হকের টাকাই পাচ্ছি।

    প্রশ্ন: এক অতিসাধারণ গৃহবধূ, যার দিন কাটত সংসারের কাজ আর সন্তান সামলানো নিয়ে, আজ সব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন রাস্তায়। মানুষকে তাঁর এই লড়াইয়ে পাশে থাকতে বলছেন। কীভাবে এল এই পরিবর্তন?

    উত্তর: আমার আল্লা আশীর্বাদ করেছেন আমায়। আর দ্বিতীয়, আমার কন্যা তামান্না। ও চলে যাওয়ার পর দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে আমার। মাথার উপর ছাদ নেই, পায়ের তলায় মাটি নেই। ফলে ভয়টাই কেটে গিয়েছে। কাল যা হওয়ার তা আজই হতে পারে— কে বোমা মারল, কী বিপদ এল, তা নিয়ে আর ভাবি না। আল্লাহ আর তামান্নার আশীর্বাদ আছে বলেই আমি আজ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছি। সংসার সামলাতে পারছি যেমন, তেমন অন্যায়ের প্রতিবাদও করতে পারছি।
  • Link to this news (প্রতিদিন)