‘বীরভূম জেলার মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি’, সিউড়িতে মমতার সভায় জনগর্জন
বর্তমান | ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: চৈত্র শেষের তপ্ত দুপুরে বীরভূমের লাল মাটিতে মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় জনজোয়ার আছড়ে পড়ল। উপলক্ষ্য ছিল সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে নির্বাচনি সভা। কিন্তু, ইরিগেশন কলোনির মাঠের ভিড় আর উন্মাদনা ছাপিয়ে সেই সভা কার্যত পরিণত হল বিজেপির বিরুদ্ধে এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতিতে। জনগর্জনে কেঁপে ওঠা মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘নির্বাচন হল রাজনৈতিক যুদ্ধ। এখানে মাথা নত করার প্রশ্নই নেই। আমরা মাথা নত করব কেবল মানুষের কাছে। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি কাউকে ছাড়া হবে না।’
এদিন বক্তৃতার শুরুতেই বীরভূমের প্রতি নিজের আবেগের কথা তুলে ধরেন নেত্রী। তিনি বলেন, ‘বীরভূমের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। এই জেলায় আমার মায়ের ও বাবার বাড়ি। তাই এই জেলার সঙ্গে আমার অনেক আবেগ জড়িয়ে।’ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইট উপাধি ত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার মাটির ভূমিকা অপরিসীম। বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘ভোটের সময় যারা ভাঁওতা দেয়, তারা পরে শুধু বুলডোজার চালাতে জানে। কালকেই শুনলাম কেউ বলে গিয়েছেন(যোগী আদিত্যনাথ) উত্তরপ্রদেশের মতো এখানেও বুলডোজার চলবে। আমি বুলডোজারে বিশ্বাস করি না, আমি মানবিকতা আর ভালোবাসায় বিশ্বাস করি। আমার ধর্মের নাম মানবধর্ম।’
সিউড়ি-নলা রেলপথের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিজেপি প্রার্থীকে তোপ দেগে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘রাজনগরের রেললাইন করে দেবে? বাংলার জন্য কী করেছে ওরা? রেলমন্ত্রী হিসাবে আমি দু’লক্ষ কোটি টাকার উপর প্রজেক্ট করেছিলাম, যা এখনও চলছে। ভোটের আগে যারা বড় বড় কথা বলে, তারা আসলে স্বৈরাচারী, অত্যাচারী আর ভোটকাটারি।’
এনআরসি ও ডিলিমিনেশন নিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে নেত্রী বলেন, ‘আগে বলবে ডিলিমিনেশন করব, তারপর বলবে এনআরসি। শেষে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।’ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালির উপর হওয়া অত্যাচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে হোটেল দাও না, বাংলা ভাষায় কথা বললে মারো, ওড়িশায় বাঙালির উপর অত্যাচার করো-কোন লজ্জায় তোমরা বাংলার মানুষের কাছে ভোট চাইতে আস? যখন অত্যাচার হয়, তখন মুখে ললিপপ নিয়ে বা প্লাস্টার করে বসে থাকো কেন?’
এদিন মঞ্চ থেকে সরাসরি দিল্লি জয়ের হুংকার দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তাঁর কথায়, ‘বাংলাকে টার্গেট করেছে? আমরা এবার দিল্লি টার্গেট করব। আমি যদি রাজনীতি বুঝে থাকি, তবে বলছি ২০২৬ থেকেই ওদের অধঃপতন শুরু হয়ে গিয়েছে। ওদের পতন হবেই।’
বিরোধীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘৫০০ টাকা করে দিয়ে বিহার-ইউপি থেকে লোক এনে মিছিল করাচ্ছে। ওরা ভোটার নয়, বহিরাগত। মনে রাখবেন, ২৯৪টা আসনেই আমি প্রার্থী।’ সবশেষে দলীয় কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে মমতা বলেন, ‘ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে মানুষের স্বার্থ বড়।’ এদিন মঞ্চে উঠে অনুব্রত মণ্ডল ও কাজল শেখের মধ্যে চলমান বিবাদ নিয়েও সতর্ক করে দেন দলনেত্রী। নেত্রীর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘দলে কোনো গ্রুপবাজি চলবে না। সামনে ভোট, সবাই মিলে কাজ করো। নইলে আমাকে অন্য কিছু ভাবতে হবে।’ তৃণমূল সূত্রের খবর, মুরারইয়ে এই দুই গোষ্ঠীর লড়াইয়ের জেরে দলে অন্তর্ঘাত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে নেত্রীকে চিঠি দিয়েছেন প্রার্থী মোশারফ হোসেন। তারপরই দুই দাপুটে নেতার দলনেত্রীর রোষের মুখে পড়ার ঘটনা নিয়ে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। ইরিগেশন কলোনির মাঠে তৃণমূল সুপ্রিমোর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনি জনসভা। নিজস্ব চিত্র