নয়াদিল্লি: ভোট বড়ো বালাই! তাই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের প্রভাব গোটা বিশ্বে জ্বালানির দামে পড়লেও ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দর ওঠানামা করেনি। কেবলমাত্র রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে একদফা। তাতেই গণক্ষোভের আঁচ যথেষ্ট টের পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন শিয়রে থাকায় আর ঝুঁকি নিতে পারেনি বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার। আর সেই কারণে বিপুল লোকসান সত্ত্বেও পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রলিয়াম—তিন সংস্থারই ক্ষতির বহর পৌঁছে গিয়েছে দৈনিক দেড় হাজার কোটি টাকায়। চলতি দামে পেট্রল বিক্রি করে প্রতি লিটারে লোকসান হচ্ছে ১৮ টাকা। আর ডিজেলে আরও বেশি। ৩৫ টাকা। এই পরিসংখ্যানে একটাই ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে— পাহাড়প্রমাণ এই ক্ষতির বোঝা বেশিদিন বইতে পারবে না তেল সংস্থাগুলি। স্রেফ নির্বাচন পর্ব মিটে যাওয়ার অপেক্ষা, তারপরই চড়া হারে দাম বাড়বে পেট্রল-ডিজেলের।
মঙ্গলবার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যাসেট ম্যানেজিং সংস্থা ম্যাককুয়ারি গ্রুপের একটি রিপোর্ট এমনই জল্পনা উসকে দিয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান ফুয়েল রিটেল’ শীর্ষক সেই রিপোর্টে সাফ জানানো হয়েছে, ‘পেট্রল-ডিজেলের বাজার দর (স্পট প্রাইস) ব্যারেল প্রতি ১৩৫-১৬৫ ডলার হলে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি ক্ষতির অঙ্ক হবে প্রতি লিটার পেট্রলে ১৮ টাকা এবং ডিজেলে ৩৫ টাকা।’ সংস্থার হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ১০ ডলার করে বাড়লে লোকসানও লিটারে ৬ টাকা হারে বৃদ্ধি পাবে। ভারতের খুচরো বাজারে পেট্রপণ্যের দাম ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে বদলায়নি। এক দশকেরও বেশি আগে পেট্রল ও ডিজেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার উপর ছেড়ে দিয়েছে কেন্দ্র। তবে ভোটের দামামা বেজে গেলে সেই নিয়মে ব্যতিক্রম আসে। বাজারে তোলপাড় পড়লেও নির্বাচনের সময় পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। এবারও তার অন্যথা হয়নি। ইতিমধ্যে অসম, কেরল ও কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরিতে ভোট সম্পন্ন। বাকি রয়েছে তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ। এই দুই রাজ্যেই কঠিন লড়াই বিজেপির। দক্ষিণের রাজ্যে ডিএমকের বিরুদ্ধে এবং বাংলায় অগ্নিকন্যা মমতার বিরুদ্ধে। তাই এখনই এমন কোনও পদক্ষেপ নিতে রাজি নয়, যা বুমেরাং হতে পারে। ম্যাককুয়ারি গ্রুপ জানিয়েছে, ‘ভোটপর্ব মিটে গেলে এপ্রিলে পেট্রল ও ডিজেলের খুচরো দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছি।’
গত দু’-তিন বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করেছে বিস্তর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি দাম ১০০ ডলার পার করে যায়। এরপর তা কমতে কমতে ৭০ ডলারে নেমে আসে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে গতমাসে অশোধিত তেলের দাম একসময় ১২০ ডলার পার করে গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা এবং শান্তি আলোচনা শুরুর পর হরমুজ প্রণালী খোলার আশায় আবার তা কমে ৯২ ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তথ্যভিজ্ঞ মহলের মতে, অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এর আগে এমন সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় দু’বার অন্তঃশুল্ক কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে কেন্দ্র। গত মার্চেও প্রতি লিটারে ১০ টাকা অন্তঃশুল্ক কমিয়েছে কেন্দ্র। সেন্ট্রাল লেভিও নিম্নমুখী। একটি সূত্র জানাচ্ছে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান যুদ্ধের জেরে সংকটের আশঙ্কায় গত মাসে পেট্রল-ডিজেল কেনার ধুম পড়ে গিয়েছিল। বেশ কয়েকদিন ধরে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দৈনিক লোকসানের বহর দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। লোকসান কমে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তবে মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির জেরে আগের লাভ মুছে গিয়ে আবার লোকসান শুরু হয়েছে।