৩৬ হাজার নাম বাদ! ‘মতুয়াগড়’ উদ্ধারে বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন তৃণমূলের তরুণ তুর্কি ঋতুপর্ণা
প্রতিদিন | ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রখর রোদে খালি পায়ে হেঁটে চলেছেন তরুণী সাধ্বী৷ চড়কপূজোর লাল পোশাকে ধুলো। ক্লান্তির গাঢ় ছাপ চোখেমুখে৷ তবু হাতজোড় করে বয়স্কদের প্রণাম করছেন। কখনও বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। ইনি বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ঋতুপর্ণা আঢ্য। বয়স বছর ছাব্বিশ৷ বনগাঁ পুরসভায় কংগ্রেসের টিকিটে জয়লাভ করলেও তৃণমূলের হয়ে এটাই তাঁর প্রথম বিধানসভা ভোট৷
রাজনীতিতে পরিবারের ধারাই বহন করছেন কল্যাণী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ঋতুপর্ণা। তাঁর বাবা শঙ্কর আঢ্য এবং মা জ্যোৎস্না আঢ্য দু’জনেই বনগাঁ পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রধান। বাবা-মাকে রেখে ঋতুপর্ণা কর্মীদের নিয়েই প্রচার করছেন। তাঁর বাড়ি বনগাঁ পুরসভার শিমুলতলা এলাকায়৷ সে কারণে বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভার বিজেপির পক্ষ থেকে ঋতুপর্ণা আঢ্যকে বহিরাগত গত দাবি করে চাপা প্রচার চলানো হচ্ছে৷ তৃণমূলের অন্দরেও ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের কাউকে প্রার্থী না করায়৷ তবে ঋতুপর্ণার প্রচার কৌশল দেখে অনেকেই মনে করছেন এটাই তৃণমূলের মাস্টারস্ট্রোক৷ স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের কথায়, কোনও বাছবিচার ঋতুপর্ণা করেন না। যে কোনও জায়গায়, যেখানে-সেখানে যখন-তখন তিনি ঢুকে পড়ছেন, কথা বলছেন, ভোট (West Bengal Assembly Election 2026) চাইছেন৷ বাড়ির মেয়ে হিসেবে পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন। ঋতুপর্ণার প্রচার কৌশল দেখে তৃণমূল নেতারা আশায় বুকও বাঁধতে শুরু করেছেন।
বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রে ২০২১ সালে বিজেপি প্রার্থী স্বপন মজুমদার মাত্র ২ হাজার ৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। সেই ব্যবধান গত লোকসভা ভোটে বেড়ে হয় ১৮ হাজার। এবারও স্বপনবাবুই বিজেপির প্রার্থী৷ গত বিধানসভা ভোট ও লোকসভা ভোটের নিরিখে বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রটি বিজেপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। সিপিএম প্রার্থী কৃষি দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী আশিস সরকার । তিনিও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচার করছেন। ২০১১ সালের পর কর্মীদের অনেকেই তৃণমূল বা বিজেপিতে যোগদান করেছেন। তারা সাংগঠনিকভাবে এখন অনেকটাই দুর্বল৷ আশিসবাবু বলেন, “এবার যত বেশি সম্ভব সিপিএমের ভোট আমরা বাড়াব৷ ২০২১-এর নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী দশ হাজার ভোট পেয়েছিল।” কংগ্রেস প্রার্থী কিশোর বিশ্বাসও এবার ভোট বাড়ানোর জন্য লড়ছেন।
২০১১ সালে বনগাঁ আসনটি ভেঙে বনগাঁ উত্তর এবং বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্র হয়। ২০১১ এবং ২০১৬ সালে বনগাঁ দক্ষিণ থেকে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের সুরজিৎ বিশ্বাস। তবে গত কয়েক বছরে এলাকায় বিজেপির প্রভাব বেড়েছে। আবার গত বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও পঞ্চায়েত ভোটে এখানে ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ১১টিতে জয়লাভ করেছিল তৃণমূল। একমাত্র ফুলসরা গ্রাম পঞ্চায়েতটি বিজেপির দখলে। যদিও সেখানেও উপপ্রধান তৃণমূলের।
এই বিধানসভা এলাকায় প্রচুর মতুয়াদের বাস। এসআইআরে তাঁদের অনেকরই নাম বাদ পড়েছে। সব মিলিয়ে নাম বাদের সংখ্যাটা ৩৬ হাজারের বেশি। ভোটার কমে দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ২৮ হাজার। বাদ পড়া মতুয়াদের একাংশ পথে নেমে আন্দোলনও করেছেন। মতুয়া সমাজের বক্তব্য, “বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কোনও হিন্দু মতুয়ার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না। তাহলে গেল কেন। বিজেপিকে জবাব দিতে হবে।” যদিও কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর আশ্বাস দিয়েছেন,”যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁদের সিএএ-তে আবেদন করতে হবে। তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন এবং পরবর্তী সময়ে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে।” তবে এই আশ্বাসে মতুয়ারা কতটা ভরসা পাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিজেপির অন্দরেই।
এসআইআর ও মতুয়াদের নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে বিজেপি প্রার্থী স্বপন মজুমদারের দাবি,”মতুয়া প্রভাবিত বুথে তৃণমূল বিএলওদের দিয়ে মতুয়াদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। মতুয়া উদ্বাস্তুরা এটা বুঝতে পেরেছেন। তৃণমূল ওঁদের যে কটা ভোট পেত, এখন তাও পাবে না।” স্বপনের অভিযোগ, “ঋতুপর্ণা তফসিলি না হয়েও জালিয়াতি করে শংসাপত্র বের করেছেন। মানুষ তার জবাব দেবে।” পালটা ঋতুপর্ণা বলছেন, “রাজনৈতিক লড়াইয়ে এঁটে উঠতে না পেরে কুৎসা করছে বিজেপি। মানুষের উপর আমার আস্থা রয়েছে৷”
বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভার বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে যমুনা-ইছামতি নদী বয়ে গিয়েছে৷ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত৷ সীমান্তের বহু জায়গায় কাঁটাতার না থাকায় চোরাচালানের অভিযোগ৷ বর্ষা এলেই ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়, তাই নদী সংস্কার, খালবিল সংস্কারের দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে স্থানীয়দের৷ তাছাড়া এলাকায় কোনও কল-কলকারখানা নেই। ঋতুপর্ণার অভিযোগ, স্বপন মজুমদার পাঁচ বছর বিধায়ক থাকলেও মানুষের এই সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেননি৷ যদিও পাল্টা তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধেই এলাকায় উন্নয়ন করতে না দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন স্বপন৷
একদিকে এসআইআরে এলাকার বহু মতুয়ার নাম বাদ৷ অন্যদিকে মানুষের দাবি পূরণ না হওয়া৷ ফলে কিছুটা চাপে বিজেপির স্বপনবাবু। এখন তৃণমূলের তরুণ তুর্কি ঋতুপর্ণা বাজিমাত করবেন, নাকি সংগঠন ও ধর্মীয় মেরুকরণের জেরে ভোটাররা ফের স্বপনের উপরই আস্থা রাখবেন, সেটাই দেখার।