কলকাতা দক্ষিণের শহরতলি গড়িয়া ছাড়িয়ে কিছুটা এগোলে এক অদ্ভুত পরিবেশ! একদিকে বিশাল হাইরাইজ তো উলটোদিকে বসতি। এপাশে উন্নয়নের জোয়ার, ওপাশে তার ছিঁটেফোঁটা প্রভাবও পড়েনি। পথঘাট কিছুটা মসৃণ, বেশিরভাগ ভাঙা। পরিচ্ছন্নতার অবস্থাও তথৈবচ। এলাকাটি আসলে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অন্যতম সদর শহর সোনারপুর। অবস্থান বড় গোলমেলে। কলকাতা ঘেঁষা হওয়ায় আবহাওয়া বেশ আধুনিক, অথচ সুযোগসুবিধায় কয়েকযোজন পিছিয়ে। রাজ্যে নির্বাচনী মানচিত্রে আবার সোনারপুর উত্তর ও সোনারপুর দক্ষিণ – দু’টি আলাদা বিধানসভা কেন্দ্র। এর মধ্যে ছাব্বিশের ভোটের (West Bengal Assembly Election) অন্যতম হটস্পট হয়ে উঠেছে সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্র। এখানে ভোটের লড়াই কেমন, দেখে এল ‘সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল।’
এখানে একেবারে তারকাদের জমজমাট লড়াই। তৃণমূলের প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক লাভলী ওরফে অরুন্ধতী মৈত্র, বিজেপির হয়ে লড়ছেন অতীতে ছোটপর্দার ‘দ্রৌপদী’ রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। বামেরা এখানে সিপিআই-কে আসনটি ছেড়েছে। তাদের হয়ে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন পারমিতা দাশগুপ্ত। আরও এক লড়াকু মুখ রয়েছে এখানে। তিনি তৃণমূলত্যাগী ছাত্রনেত্রী রাজন্যা হালদার। এই কেন্দ্রে নির্দল প্রতীকে লড়ছেন প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী। দুই ফুলের মাঝে লড়াইয়ে ‘কাঁটা’র মতোই রাজন্যা। আর তাতেই লড়াই আরও জমজমাট হয়ে গিয়েছে।
সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র সম্পর্কে প্রাথমিক কয়েকটি তথ্য জেনে নেওয়া যাক। এখানকার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৫২১। পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৬৯৮, মহিলা ১ লক্ষ ৩১ হাজার ৮০৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এখানে ১৭ জন। সংখ্যালঘু এখানে মূলত মুসলিম, তাঁদের সংখ্যা ৭৫ হাজার ৭২৮। এসআইআরের জেরে অবশ্য বহু নাম বাদ গিয়েছে। সংখ্যাটা কমবেশি সাড়ে ২১ হাজার। আসন্ন ভোটে তার একটা বড় প্রভাব পড়বে এখানে। পুরসভা ও পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে থাকলেও চম্পাহাটি, কালিকাপুরে পঞ্চায়েত সমিতির কিছু আসনে সিপিএম জয়ী হয়েছিল। তবে তাদের প্রভাব এখানে বিশেষ পড়বে না বলেই মত স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের।
একাধিক ইস্যুতে ভোটের (West Bengal Assembly Election) লাইনে দাঁড়াচ্ছেন সোনারপুর দক্ষিণের ভোটাররা। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানীয় জলের সমস্যা। কেন্দ্রীয় সরকারে ‘অম্রুত প্রকল্পে’ ঘরে ঘরে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার যে কাজ হওয়ার কথা ছিল, তার একবিন্দুও হয়নি। ফলে জলসমস্যায় জেরবার বাসিন্দারা। বছরের পর বছর ধরে এখানে নয়ানজুলি, জলাজমি ভরাট করে বহুতল তৈরির অভিযোগ রয়েছে। আর সেই কারণে এখানে নিকাশি ও জল জমার সমস্যা বেড়েছে। আর বিগত বছরগুলিতে তার সমাধানও করতে পারেননি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। কোনও এক জায়গায় জল জমার সমস্যা সমাধান হলে অন্যত্র তা রয়েই যাচ্ছে। এছাড়া পুকুর ভরাটের অভিযোগও রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাতে নির্মিত বাড়ি বা বহুতল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বছরভর এমন নানা সমস্যা সঙ্গে নিয়েই দিনযাপন করেন তাঁরা। এছাড়া রাস্তাঘাট তো আছেই। নরেন্দ্রপুর থেকে রাজপুর হয়ে বারুইপুর যাওয়ার সড়কপথ একেবারে ভাঙাচোরা। অটো বা বাসে সওয়ার হলে নিত্যদিন ঝাঁকুনি সঙ্গী জনতার। এসব নাগরিক সমস্যার সমাধান চেয়েই এবার জনপ্রতিনিধি বেছে নেবেন জনতা।
২০১১ সালে গোটা রাজ্যের মতো সোনারপুর দক্ষিণেও পরিবর্তন হাওয়া খেলে গিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই প্রার্থীকে হারিয়ে বিধায়ক হন তৃণমূলের জীবন মুখোপাধ্যায়। ২০১৬ সালেও তিনি নিজের গড় রক্ষা করেছিলেন। পরেরবার অর্থাৎ ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে শাসকদল প্রার্থী করে ছোটপর্দার জনপ্রিয় মুখ লাভলী তথা অরুন্ধতী মৈত্রকে। তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ পছন্দের। প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষায় অবশ্য লাভলী বেশ ভালো রেজাল্ট করেন। গেরুয়া শিবিরের প্রতিপক্ষ আরেক অভিনেত্রী অঞ্জনা বসুকে হারান ২৬ হাজারের বেশি ভোটে। ছাব্বিশে অবশ্য লাভলীর প্রার্থী হওয়া নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তা ছিল। খোদ দলনেত্রীই তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে এবার আর টিকিট দেব না।’ তার কারণ অবশ্য গত ৫ বছরে বিধায়ক লাভলীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ। কোনও কাজ তিনি করেননি বলে অভিযোগ ওঠায় মমতার এমন ভর্ৎসনা। শোনা যায়, একথা শুনে লাভলী কান্নাকাটি করেন। সোনারপুর দক্ষিণে ঘাসফুল শিবিরের হয়ে ফের প্রার্থীও হন। এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পদ্মশিবিরের তারকা প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
সোনারপুর দক্ষিণ ঘুরে দেখা যাচ্ছে, লাভলী যতই সিরিয়ালপ্রেমীদের মনে দাগ কাটুন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনতাকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। এলাকাবাসীর মুখে প্রায়ই অভিযোগের সুর, গত ৫ বছরে তাঁকে বিশেষ দেখা যায়নি, কোনও কাজ তিনি করেননি। তিনি ফের নির্বাচিত হয়ে এলে কোনও পরিষেবা পাওয়া যাবে না বলেই মনে করছেন তাঁরা। আবার ছোট ব্যবসায়ীদের একাংশের মত, চারপাশে তৃণমূলী হাওয়া, এবারও তৃণমূলই জিতছে। কেউ কেউ বলছেন, ৫ বছর শুধু নয়, তৃণমূল গত ১৫ বছরে এরাজ্যে যে অতুলনীয় কাজ করেছে, তার উপর ভিত্তি করে এবারও তৃণমূলের জয় নিশ্চিত। অর্থাৎ লাভলী নিজের জোরে নয়, জিতলেও জিতবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে! লাভলী নিজে কী বলছেন? তাঁর কথায়, ”আমি এখানে বরাবর থাকি। লোকজন ডাকলেই আমাকে পান। যতটা পেরেছি কাজ করেছি। আশা করি, আমাকে জনগণ আবার কাজের সুযোগ দেবেন। তাছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা উন্নয়ন করেছেন, তার সুবিধা আরও বেশি করে পেতে হলে এবং বিজেপির ঘৃণা, হুমকির রাজনীতি থেকে সুরক্ষিত থাকতে চাইলে তৃণমূলকে জেতান, এটাই আমার আবেদন।”
অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের জয়ের সম্ভাবনা কতটা? সেই অঙ্কও কিন্তু বেশ ভাবাচ্ছে। এলাকার মহিলাদের নিয়ে মন্দিরে পুজো দিয়ে রূপা প্রায় রোজ প্রচার করছেন। এক্ষেত্রে জনসংযোগেই তিনি বেশ ভালো নম্বর পেয়ে যাচ্ছেন। মহিলারা রীতিমতো মুগ্ধ রূপার ভালো ব্যবহার আর নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে। তাঁরা আশাবাদী, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly) বিধায়ক হলে অনেক সমস্যারই দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। এলাকার বিজেপি নেতৃত্বও তো ১০০ শতাংশ আশাবাদী তাঁদের প্রার্থী জয় নিয়ে। এক যুব কর্মী তো বলেই ফেললেন, ”যেদিন থেকে এখানে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হয়েছে, সেদিন থেকে তিনি জিতেই গিয়েছেন।” স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ”এবার বিজেপি আসবেই। সবাই চাইছে, কিছু করার নেই।”
বামেদের প্রার্থী এখানে সিপিআইয়ের পারমিতা দাশগুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, ”এতদিন এখানে তৃণমূল বিধায়ক কোনও কাজ করেননি। তার ছাপ স্পষ্ট সর্বত্র। আর বিজেপি যেভাবে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করেছে, সেটা তো এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না। সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে বরাবর হিন্দু-মুসলিমরা সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করেন, একে অন্যের উৎসবে শামিল হয়। এখানে বিজেপির রাজনীতি চলবে না। এই দুই দলের বিকল্প হিসেবে মানুষ বামপন্থীদের ভোট দেবে বলেই আমার মনে হয়।”
এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঝে কিন্তু আরেক ভূমিকন্যাও প্রচারে নজর কাড়ছেন। তিনি একদা তৃণমূলের ছাত্রনেত্রী রাজন্যা হালদার। সদ্যই নিজের দল গঠন করেছেন, নাম তার জনসংগ্রাম মঞ্চ। তবে এখনও প্রতীক না পাওয়ায় তিনি এবার নির্দল হয়েই লড়ছেন। মাথায় বড় জটা, পরনে শাড়ি। ঝকঝকে মুখ আর স্পষ্ট কথা নিয়ে জনতার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন রাজন্যা। বলছেন, ”তিনি পাশের বাড়ির মেয়ে, তাঁকে একবার জনতার কাজ করার সুযোগ করে দিন।” কিন্তু রাজন্যার কথায় কি ভোটারদের মন ভিজবে? সেটা তো বড় প্রশ্ন অবশ্যই। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, রাজন্যা কার ভোটব্যাঙ্কে কতটা ভাগ বসাবেন, সেই অঙ্ক। সবকিছুর উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে।