বাসস্ট্যান্ড, বাজার হোক বা স্থানীয় আড্ডার ঠেক। চার দিকে উড়ছে লিফলেট। যেখানে বলা আছে, ‘ভোট দেওয়ার আগে মনে রাখবেন’। ছাপা অক্ষরে মনে করানো হচ্ছে, রাজ্যে স্নাতক বা তার ঊর্ধ্বে ডিগ্রিধারী তরুণ প্রজন্মের ৪৭.৬% বেকার। কাজের খোঁজে ৪০ লক্ষ মানুষ পাড়ি দিয়েছেন ভিন্ রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের জন্য ৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ। আর সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা উন্নয়নের জন্য ৫৭০০ কোটি টাকা।
কলকাতা থেকে আসা কানে কথাগুলো যেন কেমন চেনা চেনা লাগে! মনে করতে হয়, নিউ টাউনের হোটেলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের উপরে বিজেপির যে ‘চার্জশিট’ তৈরি করেছিলেন, সেখানেই ঠাসা ছিল এই সব তথ্য ও তত্ত্ব। সে ‘চার্জশিট’কে কেবলই একটা নথি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি বিজেপি এ বার। শহরে, মফস্সলে, গ্রামে প্রচার-পত্র করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দেদার। এলাকাভিত্তিক সংগঠন যেমনই থাকুক, বিজেপিকে ‘মনে রাখতে’ হবে— এটাই কৌশল তাদের! মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু-অধ্যুযিত জেলায় যদি এমন ছবি চোখে পড়ে, অন্যত্র তার দৃশ্যমানতা স্বাভাবিক ভাবেই আরও বেশি।
শুধু ‘পরিবর্তনে’র হাওয়ায় ভেসে না-থেকে জমি শক্ত করে লড়াইয়ে নামার জন্য বঙ্গ বিজেপিকে এই যাত্রায় ধরে ধরে পাঠ পড়িয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহই। বিহারের কায়দায় পশ্চিমবঙ্গকে কয়েকটা জেলাভিত্তিক ‘জ়োন’-এ ভাগ করে সাংগঠনিক যে সব বৈঠকে উপস্থিত থাকছেন শাহ, সেখানে তাঁর মন্ত্র— ‘জিতে যাব আর জিতব’র মধ্যে যে ফারাক থাকে, তাকে দূর করতে হবে! রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ মনে করেন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বঙ্গে দল ভাল করার পরে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটকে বিজেপির বড় অংশই হাল্কা ভাবে নিয়ে ফেলেছিল। ভোটের সংগঠন, গণনা-কেন্দ্রে সে ভাবে নজর থাকেনি। ভোটের ফলেও তার প্রভাব পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার মাটির সঙ্গে যোগ বাড়াতে কড়া হাতে হাল ধরেছেন শাহেরা।
মুর্শিদাবাদের কথাই ধরা যাক। সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত জেলা হওয়ায় তার বিপরীতে হিন্দু সংহতির একটা অবকাশ আগে থেকেই ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) নিঃশব্দ প্রয়াসের জেরে জঙ্গিপুর-সহ জেলার উত্তরাংশে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভাল ভোট পাচ্ছে বিজেপি। মেরুকরণের সঙ্গে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে জুড়ে দিয়ে গোটা জেলাতেই এ বার সেই প্রচেষ্টা অনেক বাড়িয়েছে বিজেপি। রঘুনাথগঞ্জের শহুরে এলাকায় পদ্ম শিবিরের প্রচার ও প্রভাব যেমন চোখে পড়ার মতো। জঙ্গিপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভায় বিপুল ভিড় বিজেপির উৎসাহ উচ্চ গ্রামে তুলেছে। মুসলিম ভোট ভাগাভাগি হলে আর উল্টো দিকে হিন্দু ভোটকে যথাসম্ভব এক জায়গায় আনতে পারলে আসন জয় অসম্ভব হবে না, এই অঙ্কে লড়ে যাচ্ছেন রঘুনাথগঞ্জের সুরজিৎ পোদ্দার বা জঙ্গিপুরের চিত্ত মুখোপাধ্যায়েরা।
গত লোকসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর, বড়ঞা ও মুর্শিদাবাদ বিধানসভা আসনে এগিয়ে ছিল বিজেপি। মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক ও প্রার্থী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলছেন, ‘‘হাওয়ার উপরে ভরসা করে বসে নেই আমরা! এ বার বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন কর্মীরা। দু’টো পুরসভা এলাকা থেকেই লিড আসবে।’’ বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মলয় মহাজনের দাবি, ‘‘হিন্দু ভাবাবেগ এখন শক্তিশালী। হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ না-হলে আমাদের ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। মুসলিম-প্রধান এই জেলায় বিজেপি আগের চেয়ে ভাল ফল করবে। উল্টো দিকে, তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল এবং টিকে আছে যে মুসলিম ভোট দিয়ে, তাতে ভাঙন ধরবে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বারবার আসতে হচ্ছে।’’ তিনি জানাচ্ছেন, অ্যাপ ও অনলাইনে এখন সাংগঠনিক তথ্য দিতে হয়, নজরদারি অনেক কড়া। এই সাংগঠনিক জেলায় ১৭৮৯ বুথের মধ্যে ১২৩০ বুথে বিজেপির লোকের ব্যবস্থা হয়েছে, যা আগে ছিল না।
কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ও বহরমপুরের প্রার্থী অধীর চৌধুরী মনে করাচ্ছেন, ‘‘তৃণমূল গত বার এনআরসি-র কথা বলে ভোটটা বার করেছিল, এ বার এসআইআর দিয়ে করতে চাইছে। বিজেপি হিন্দুত্বে হাওয়া দিয়ে পাল্টা মেরুকরণ করতে চাইছে। তবে এ বার এই মেরুকরণ সহজ হবে না। এই দু’টোর বাইরে আমরা লড়াইটা নিয়ে যেতে চাইছি।’’
শাসক তৃণমূলের এক প্রার্থীও মানছেন, জেলার পুরনো শহরগুলিতে উদ্বাস্তু মানুষ পরম্পরাগত ভাবে আছেন। হিন্দু পরিচিতি সত্তা জেগে ওঠার প্রবণতাও সেখানে বেশি। যদিও তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ-বহরমপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও কান্দির প্রার্থী অপূর্ব সরকারের মতে, ‘‘হিন্দু ভাবাবেগ ২০১৯ এবং ২০২১ সালে বেশি ছিল। এখন তার চেয়ে পরিস্থিতি উন্নত। গত বার যা জিতেছিলাম, বেশির ভাগই আমরা ধরে রাখতে পারব।’’ তাঁদের সাংগঠনিক সমস্যা? অপূর্বের বক্তব্য, ‘‘কিছু গোলমাল ছিল। এখন সামলে নেওয়া গিয়েছে। গাড়ি বেলাইন হবে না!’’
তার পরেও শাসক দলের টাউন স্তরের সংগঠন সামলানো এক নেতা মনে করছেন, ‘‘বিজেপির প্রতি ঝোঁক সব জায়গায় কমে গিয়েছে, এই রকম কিন্তু নয়। কোথায় কেমন চোরাবালি আছে, কে জানে!’’