মানচিত্রেই কেবল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত, অন্যথায় এখানে পুরোদস্তুর ‘কলকাতা কালচার’! শহর-জেলার সূক্ষ্ম সীমারেখাটুকু কবেই মুছে দিয়েছে পুরনো জনপদ বরানগর। বছর দুই ধরে এই জায়গা আবার তারকা কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচিতি পেয়েছে। আর তাই ছাব্বিশে ভোটেও (West Bengal Assembly Election) অন্যতম হটস্পট কলকাতা লাগোয়া বরানগর। একাধিক নাগরিক সমস্যার সঙ্গে রাজনীতির জটিল আবহে ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন এখানকার বাসিন্দারা। ফলাফলের দিকে তো নজর থাকবেই, তবে তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হতে চলেছে এখানকার তারকা তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়কের বিরুদ্ধে রাজনীতির ময়দানে অভিজ্ঞ বিজেপি ও বাম শিবিরের দুই সৈনিক বরানগরের মাটিতে ভোটের লড়াইতে কতটা ফায়দা তুলতে পারেন।
বঙ্গ রাজনীতিতে বরানগর বিধানসভা কেন্দ্রটি হঠাৎ কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, সেটা বুঝতে হলে বছর দুই আগে ফিরে যেতে হবে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তৎকালীন বিধায়কের দলবদল। একদিন আচমকাই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে কয়েকঘন্টার মধ্যে দলবদল করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন বর্ষীয়ান নেতা তাপস রায়। সেবার তিনি কলকাতা উত্তর থেকে বিজেপির প্রার্থীও হন, কিন্তু সেখানকার অভিজ্ঞ, জনপ্রিয় সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করতে পারেননি। তবে বরানগর হয়ে গিয়েছিল বিধায়কশূন্য। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্ব দেন দলের কর্মপটু, তারকা সদস্য সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আর বিজেপি এগিয়ে দিয়েছিল স্থানীয় নেতা সজল ঘোষকে, যিনি কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর হিসেবে। ততদিনে বিরোধী আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। নানান ইস্যুতে পুরসভায় তাঁর বিরোধিতা জনতার নজর কেড়েছিল। যদিও পদ্মপ্রার্থী হয়ে উপনির্বাচনে বরানগরের দখল নিতে ব্যর্থ হন সজল। সায়ন্তিকার জনসমর্থনের কাছে তাঁকে নাস্তানাবুদ হতে হয়। ছাব্বিশে আবার একই রণাঙ্গনে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন তিনি। তবে বরানগরে সায়ন্তিকা-সজলের পুরনো ডুয়েলে কিছুটা নতুন রং যোগ করছেন সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্র। রাজ্যস্তরে কমরেড সায়নদীপ যথেষ্ট পরিচিত এবং ওজনদার। বাগ্মী হিসেবে নামডাকও আছে। তার চেয়েও বড় গুণ তাঁর মিশুকে স্বভাব। যাতে আরও শান দিতে তিনি ঘরে ঘরে প্রচার সারছেন। ফলে এবার বরানগরে পুরোপুরি ত্রিমুখী লড়াই।
বরানগরের মোট জনসংখ্যা ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫৪১ জন। এসআইআরের পর মোট ৩৪২৫ জনের নাম বাদ পড়ায় এখন সেই সংখ্যা খানিকটা কমেছে। বেশিরভাগই হিন্দু বাঙালি, মুসলমান জনসংখ্যা ৩ থেকে ৪ শতাংশ মাত্র। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের সময় বরানগরের লাল দুর্গেও ফাটল ধরে। বামেদের আরএসপি প্রার্থী সুকুমার ঘোষকে হারিয়ে দেন তৃণমূলের তাপস রায়। ২০১৬ এবং ২০২১ – পরপর দু’বারের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। তবে ছাব্বিশে তাঁর জায়গায় তৃণমূল প্রার্থী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি উপনির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।
বিধায়ক হওয়ার পর থেকে সায়ন্তিকার উপস্থিতি বিধানসভা এলাকায় ভালোই ছিল। দেড় বছরের মধ্যে বিধায়ক তহবিলের অর্থ দিয়ে রাস্তা সংস্কার থেকে শুরু করে আলো, স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের বেশ কিছু কাজও করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, বালিকা বিদ্যালয় স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন বসানো এবং মহিলাদের আত্মরক্ষায় প্রশিক্ষণ শিবির চালু করা। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধায়ক হওয়ার পর থেকে সায়ন্তিকা স্থানীয় নেতা এবং কাউন্সিলরদের একজোট করার কাজটি বরাবর করে গিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে তবেই কাজের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জরুরি পরিস্থিতিতে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে বিধায়কের কার্যালয়। সকলকে নিয়ে এই যে চলার ক্ষমতা টলি নায়িকার, সেটা তৃণমূল স্তরের কর্মীদের খুবই পছন্দের।
নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে তৃণমূল প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলেও মেনে নিচ্ছেন ভুলত্রুটি হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে প্রচারে গিয়ে তাঁর আবেদন, ”ভুল সংশোধন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিন।” তবে নিকাশি সমস্যার পূর্ণ সমাধান যে কঠিন, তাও মেনে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘গামলা’ মন্তব্য যথেষ্ট ট্রোলড হয়েছে। প্রতিবাদে আবার গামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় মিছিলও করেছে বিজেপি। বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে, সায়ন্তিকার মন্তব্য ট্রোলযোগ্য। তবে সেসবকে থোড়াই কেয়ার নায়িকার! ডিজিটাল প্রচারের পাশাপাশি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে দুয়ারে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন সায়ন্তিকা। এটাও স্বীকার করে নিচ্ছেন, অল্প বৃষ্টিতে এখানে জল জমার যে সমস্যা আছে, তার সমাধান সহজ নয় মোটেও। তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের মেয়ের মতো আপনজনসুলভ আচরণে ইতিমধ্যে আমজনতার মুগ্ধতা নায়িকার প্রতি।
অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষও পাড়ায় পাড়ায় ভালোই প্রচার করছেন। বরানগরের মূল সমস্যা এখনও নিকাশি ও রাস্তাঘাট। তাকে তুলে ধরে সজলের দাবি, তিনি জিতলে এই সমস্ত সমস্যা মিটিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তাঁর নিজের দলের আদি কর্মীরাই যেসব বিস্ফোরক অভিযোগ তুলছেন, তাতে ভোটের মুখে সজলের ইমেজ বেশ খানিকটা টাল খেয়েছে। সম্প্রতি এক আদি বিজেপি কর্মী অভিযোগ তুলেছিলেন, সজল ঘোষ নাকি বারবার বলেন যে জিতলে তিনি তৃণমূলে যোগ গিয়ে মন্ত্রী হবেন। এমন কথা ছড়িয়ে পড়লে তা সজলের জয়ের পথে কাঁটা তো বটেই!
আবার সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্র প্রচারে জোর দিচ্ছেন তৃণমূল-বিজেপির ‘সেটিং’ তত্ত্বে। বরানগরে এখনও সিপিএম কর্মী, সমর্থকদের ভালো উপস্থিত রয়েছে। সেই জনবল নিয়ে সায়নদীপ দিনরাত প্রচার চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক সৌজন্যও তাঁর নজিরবিহীন। সিপিএমের মিছিলের পাশে তৃণমূলের রোড শো এলে রাস্তা ছেড়ে দেন সায়নদীপ। রাজনীতির লড়াইতে অবশ্য একচুল জমি ছাড়ার ব্যাপার নেই। সায়নদীপ জনসভায় বলছেন, ”একদল ব্যস্ত দুর্নীতিতে, আরেক দল মন্দির বানাতে। এদের নিজেদের মধ্যে সেটিং রয়েছে। শাসকদলের মাথাদের হাজার বেআইনি কাজকর্ম নিয়ে কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থা কোনও তদন্ত করে না। এই রাজনীতির মধ্যে আমজনতার জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান কোথায়? কোথায় কর্মসংস্থান? বামেরাই একমাত্র এনিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের শ্রমের দাম দিতে হবে যথাযথ। বামপন্থাই একমাত্র বিকল্প।” কিন্তু তাঁর এই আহ্বানে কি আদৌ সাড়া দেবেন বরানগরবাসী? নাকি জনরায় সেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে তৃণমূল-বিজেপিতেই? উত্তর মিলবে ৪ মে।